আমিই হিমু ( RIP হিমু )

রাস্তায় হাঁটছি। মৌচাকের সামনের রাস্তা। নাম সার্থক করার জন্যই এখানে মৌমাছিরুপী মানুষেরা সব সময়ই ভিড় করে থাকে। একটা ইলেকট্রনিক্স দোকানের সামনে উৎসুক জনতার ভিড়। টিভিতে খেলা দেখাচ্ছে। লোকজন হা করে খেলা দেখছে। আর আমি তাদের দেখছি।

কিছু কিছু মানুষ আছে যারা ভিড় সৃষ্টি করতে মজা পায়। ১০ জন মানুষ দাড়িয়ে আছে দেখে আরও ১৫ জন এসে দাঁড়াল। রাস্তায় জ্যাম তৈরি হয়ে গেছে। ট্রাফিক পুলিশ তার বিড়িটা শেষ করে সামনে আগালো। মনে হয় উৎসুক জনতার কপালে আজ কিছু পুলিশি গদাম আছে।

পায়ের সামনে হঠাৎ ছপাত করে কিছু পড়লো। আকাশ থেকেই পড়লো মনে হয়। উপরে তাকিয়ে দেখি, তারের উপর একটা কাক বসে আছে। এতো মানুষ থাকতে কাক কেন আমাকে টার্গেট করলো বুঝলাম না। পুলিশ এবং পশুপাক্ষি এই দুইটা গোত্রই আমাকে পছন্দ করে। আচ্ছা, এই কাকটা খায় কি? এটার বাসা কই? কাকদের মধ্যেও কি মনিষী গোছের কেউ থাকে ?

“অ্যাই অ্যাই যে, শুনুন। আপনি হিমু না?”
তাকিয়ে দেখি,একজন তরুণী আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।
আমি চোখ না নামিয়েই বললাম, জী না। হিমুর মুখোশ পরেছি। আসল হিমু আমি না ।
“মানে কি?”
মেয়েরা এই “মানে কি” প্রশ্নটা করতে খুব বেশি পছন্দ করে। এটা তাদের স্বভাবজনিত অসুখ। এধরনের প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে নেওয়ার কিছু নেই।
আমি বললাম- আসল হিমুর সাথে সবসময় সুন্দরী তরুণীদেরই দেখা হয়। আর যেহেতু আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছে, সেহেতু আমি আসল হিমু না।
তরুণীর বুঝতে কয়েক মুহূর্ত লাগলো আমি কি বুঝাতে চেয়েছি। বুঝার পর তার ফর্সা মুখটা কালী হল। জ্বলন্ত আগেয়গিরির বিস্ফোরণ হবে নাকি?

“আপনি আমার সাথে ফাইজলামি করেন? জানেন আমি কে? আপনি কোন সাহসে আমাকে কুৎসিত বলেন? আপনি জানেন আমি আপনাকে এই মুহূর্তেই জেলের ভাত খাওয়াতে পারি?”

“জগত সংসারে সৌন্দর্যই তো সব কিছু না। আমরা সাধারন মানুষরা এই সৌন্দর্য দেখেই বিভ্রান্ত হই। এই নশ্বর জিনিসটির জন্যই ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়েছিল। সৌন্দর্যের জন্য এখনো সব দেশেই পিটাপিটি, চুলাচালি হয়। দেশের লাখ লাখ টাকা উড়ে সুন্দরী খোজা প্রতিযোগিতার জন্য। আর এখন জেলের ভাত খেতে ইচ্ছাও করছে না। তবে আপনি চাইলে আমাকে একটা গরম কোক খাওয়াতে পারেন।”

মেয়েটা হতাশ চোখে বলল- আমাকে কি আসলেই খুব কুৎসিত লাগে ?
আমি বললাম-দেখুন,আমি তো সেটা বলছি না, সৌন্দর্য খুবই আপেক্ষিক ব্যপার। তাছাড়া আমার বলার পিছে অন্য একটা কারণও আছে।
কি কারন?
কারন হচ্ছে- আজকাল কোন সুন্দরী মেয়েরা নিজে থেকে এসে কোন পুরুষের সাথে কথা বলে না। তাদের নাক একটু উঁচু কিসিমের হয়।
মেয়েটি আবার হতাশ হয়ে বলল- সবাই তো এক রকম না হিমু ভাই। আপনিও তো সবার মত না। আপনি হিমু।

আমি আর কোন কথা না বলে সামনের দিকে হাটা শুরু করলাম।
“আরে আরে! এটা কি ধরনের ভদ্রতা! কোন কিছু না বলেই চলে যাচ্ছেন যে?”

আমি তার দিকে ফিরে মিষ্টি করে একটা হাসি দিলাম। সে পুরোপুরি বিভ্রান্ত না হলেও আধাআধি বিভ্রান্ত হল। তাকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হতে না দেখে আমি পুরোপুরি ভাবেই বিভ্রান্ত হলাম। তাহলে কি আমার হিমু থাকার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?

বিভ্রান্তি নিয়ে আমার বাবার কিছু উপদেশ আছে।
” পথ চলিতে গেলে তুমি তোমার আশেপাশে অনেক রকম বিচিত্র জিনিসই দেখিবে। পৃথিবী কণ্টকময় এবং অদ্ভুত। তুমি বিভ্রান্ত হইও না। মানুষ বিচিত্র প্রাণী। তাদের দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার মত কিছু নাই । ”

আমি আমার বাবার উপদেশ পালন করতে কিছুটা হলেও ব্যর্থ হয়েছি। একটা ঘটনা বলি।
রাস্তা থেকে যাচ্ছিলাম। পথের মধ্যে হাড় জিরজিরে এক রিকশাচালক টাল সামলাতে না পেরে ছোট একটা টেম্পো এর সাথে ধাক্কা খেল। হয়তো দুর্বলতার জন্যই। রিকশাটাই উলটে গেল। দৌড়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি করে রিকশার নিচে চাপা পড়া বৃদ্ধ কে বের করলাম।

বৃদ্ধ তখন অচেতন। জ্বরে গা পুরে যাচ্ছে। পা কেটে রক্ত ঝরছে। ভাঙল টাংলো নাকি আবার?
আরেকটা রিকশা ডেকে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে। ভর্তি করে রেখে ওষুধ কিনতে যাবো এমন সময় আমার পাশে এসে দাঁড়ালো একটা বাচ্চা। ৭-৮ বছরই হবে হয়তো বয়স বা চোখের পাশটা ফুলে বীভৎস হয়ে আছে। আমাকে দেখে বলল-ওষুধ কিনতে যাবেন?
আমি একটু অবাকই হলাম। তাড়াতাড়ি তা আড়ালও করে ফেললাম।
হ্যা, যাবো। কেন, তোমার কিছু লাগবে?
ছেলেটা গম্ভীর হয়ে বলল- আমিও যাবো।
এইটুকু পিচ্চির ভাবগাম্ভীর্য দেখে আমি বিভ্রান্ত হলাম।
তোমার বাবা কই?
চলে গেছে।
ও, মা আছে তোমার সাথে?
না, বাবা মা একসাথে চলে গেছে।
কই গেছে?
জানি না, আমাকে একা ফেলে রেখে চলে গেছে।
মানে?
আমার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগবে তো ,কান্সার। এতো টাকা তো নাই। তাই আমাকে হাসপাতালে রেখে তারা হারিয়ে গেছে।
আমি নির্বাক হয়ে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

ছেলেটা আমার পাঞ্জাবীর কোনা ধরে বলল- “আপনি আমার বাবা মার কাছে আমাকে নিয়ে যান।“
হিমুদের কাঁদতে হয়না। এক ফোটা জল কি গড়িয়ে পরল চোখের কোনা থেকে?

আমার চিকিৎসা লাগবে না। আমি বেশীদিন বাঁচবো না। যতদিন বাঁচবো, আমি আমার বাবা মার সাথে বাঁচতে চাই। আমি মনটা কেমন যেন করে। আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন না আমার বাবা মার কাছে?

আমি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। আমি তার বাবা মা কে খুঁজে বের করতে পারিনি। ছেলেটাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলাম। আমার সাথেই ছিল সে তার জীবনের শেষ কটি দিন।

মায়ায় পড়েছি দেখেই কষ্ট পেয়েছি। কষ্ট পাওয়া উচিত না। শুধু শুধু কষ্ট পেয়ে হবেটা কি ?
আমি আর কষ্ট পাবো না। রাত বাড়ছে। আমি বরং রাতের আকাশের তারা গুলোই গুনি।