ইমন জুবায়ের কে নিয়ে আকাশ অম্বরের লাইন গুলো।

রাগ ক্রোধ ঘৃণা আবেগ আর অপ্রকাশ্য স্মৃতিভাবখানি বাদ দিলে যা কিছু থাকে তাকে নামিয়ে আনা কিংবা না-আনার পার্থক্য আছে, কারণ জানি না, হয়তো এমন মানব জনম আর কি হবে, মন যা চায়, ত্বরায় করে ফেলি এই ভবে…

শুভ জন্মদিন ইমন ভাই
হ্যাঁঞ চলে আসো চলে আসো শাহাদাতকে নিয়ে

আজ থেকে প্রায় দশবারো বছর আগে, আমার বন্ধু ডাঃ শাহাদাত, আমাকে একজন মানুষের কথা শুনিয়েছিলো। বন্ধুর শব্দ ও ভাবগুলো নিজের পাত্রে ঢালার পর ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিস্ট্রির লোক, ঘর ছেড়ে বেরোয় না, জটিল জটিল কথা বলে, খ্যাপা, মাঝে মাঝে সামলানো মুশকিল, কুয়েকি চরিত্র, এয়ারি সাইন, রাশি নিয়ে খেলে; কেউ কেউ বলে পীর, পীরের কাছে গেসিলি, পীর কী কইলো ইত্যাদি। বলেছিলো কপিল নামের এক লোকের কথা, হাজার বছর আগে কপিল নামের মানুষটা নাকি বাঙালি ছিলো এই ধারণার ডিসকোর্স লিখছেন; কে কপিল, কিংবা কী কপিল সেইসব জানি না; এটার কী গুরুত্ব বুঝি না; গৌতমের ভাবমানসে বাঙলা বলতে চান; তারপর আরও শুনি এই জুবায়েরের বাসায় বিভিন্ন প্রজাতির লোকজন আসে, তখনও-খুব-একটা-বিখ্যাত-হয়নাই-টাইপের লোকেরা উল্টায় পালটায় থাকে, ইমন জুবায়ের সবার মাঝেই; এদের একজন জুবায়ের মালিক, বংশীবাদক, বন্ধু শাহাদাত এই মালিকের কাছ থেকে বাঁশী শিখতে যায়; তারপর আরও কিছুদিন পরে শুনি ব্ল্যাক ব্যাণ্ডের লিরিক্স লিখেন এই ইমন জুবায়ের, জনটন আসে, তাহসান তার কাজিন হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি।

শাহাদাত আরও বলে তমা আপার কথা। কোনএকদিন সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় রিক্সা করে তমা আপা, এই শাহাদাত, চল তোরে নিয়ে যাই একজনের কাছে। তারা দুজন চলে যায় শান্তিনগর। শাহাদাতের পরিচয় হয় তার সাথে। অসম্ভব পছন্দ করতেন আমার বন্ধুটাকে। চাকরী করেন নাই? ধীরে ধীরে বিভিন্ন সময়ে টুকটাক কথা হয় আমাদের। করেছেন অল্প কিছুদিন একসময়, ছেড়ে দিছেন। বিয়ে থা? নাহ্‌। একা একাই থাকেন। একদম একা? নাহ্‌। চারপাশে নাকি মানুষ থাকে। ওরা নাকি আপনজন। নিজের কিছু নাই ফ্ল্যাট? আছে। সেটা তো আছে।
সময় যায়। শাহাদাতের কাছে আরও কথা শুনি। ভুলে যাই কিছু। কিছু মনে রাখি। কিছু মনে গেঁথে যায়। এইসব নিয়েই একসাথে চলি। কিছু কিছু কথা উড়ায়ে দেই। কিছু কিছু কথা বুকের ভেতর তোলপাড়। তাড়াতাড়ি পাতা উল্টাই।

একসময় দেশ ছেড়ে চলে যাই। সবকিছু মনের পেছনে। ইমন জুবায়ের নামটা হালকা। জীবন নিত্য নতুন পসরা সাজায়ে রাখছে। ইমন জুবায়ের মিশে যায়, হারায়ে যায়। যন্ত্রের কৌশলে জীবন চলে। আমার ইচ্ছামতই চলে। ২০০৭ সালে বারোদিনের জন্য দেশে ফিরে আসি। যার জন্য আসি, তিনি আমি আসার সাতদিন পর মারা যান। বিক্ষিপ্ত। রাস্তার সামান্য বাঁকে হঠাৎ ঝাপসা হয় সব, ধুলাবালির ফুটপাতে শুকিয়ে যায় কিছু।
শাহাদাত বলে, চলো যাই, ইমন জুবায়ের। আমি মাথা নাড়ি। চলো যাই। হাতে সময় আছে। সময় কাটবে।

অগাস্ট/সেপ্টেম্বর মাস হবে। ঢাকায় খুব একটা গরম নাই। লিফট দিয়ে উপরে উঠি। আয়নায় নিজেকে দেখি। দুইজন মানুষ, দুইজন বন্ধু। অন্য একজন মানুষের কাছে যাচ্ছি। কেন যাচ্ছি? এই শহরে এমন একটা লোকের অর্থ কী? পুরোনো কথাগুলো হালকা মনে আসে। একাকী। রোমান্টিক। ভাববাদী। ইতিহাস জানেন। আরও অনেক কিছু জানেন। এরকম একটা লোকের কাছে যাওয়ার মানে কী। কথা বলতে আমার ভালো লাগবে। আনমনে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাই। কলিংবেল।

দরজা খুলে দেয় সম্ভবত একজন নারী। শাহাদাতকে দেখে সরে দাঁড়ায়। সদর দরজা দিয়ে ঢুকে হাতের ডানের ঘরটা। দরজা দিয়ে ঢুকি। তারপর শুধু মনে আছে যে শাদাশাদাফর্সা খালি গায়ের একটা লোক মেঝের উপর পাতা একটা পাতলা তোষক থেকে উঠে আসছেন, আমাকে দেখিয়ে শাহাদাতকে জিজ্ঞেস করছেন – আগে বলো জন্মতারিখ কবে? আর এক প্রাণখোলা হাসি। একটুপর তিনজন তিনটা জায়গায় বসে স্থির হলে আমি মানুষটার দিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করলাম লোকটার দুটো চকচকে তীক্ষ্ম চোখ আছে, সেইসাথে আছে এক চমকপ্রদ সেন্স অফ হিউমার, আর সেইসাথে টের পেলাম আমি এক প্রবল পরাক্রম ছারপোকা বাহিনীর আক্রমনের শিকার। বন্ধুপ্রবর আগে ওয়ার্নিং দিলেও আমি এদের আক্রমনের তীব্রতায় মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। বন্ধুর দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি, উসখুস করতে গিয়েও তাই নিজেকে থামিয়ে দিচ্ছি, নিজেকে এইখানে ঠিক উপযুক্ত মনে হচ্ছে না, হলে এই বাহিনীর আমারে একটু হলেও ছাড় দেয়ার কথা নিশ্চয়ই। যাহোক বন্ধুর সাথে অন্য অনেক কথাবার্তা চলার পর তিনি যথাসময়ে আমার দিকে মনোযোগ দিলেন এবং ঘড়ির হিসেবে পাক্কা দেড়ঘন্টা নবাগত আমাকে নিয়ে কথা বললেন। তিনি একটু থামলে আমি এই সুযোগে নিজের কিছু কথা বললাম, তারপর বের হয়ে আসার পর আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু আমাকে বললো এত কথা বলতে সে আমাকে আগে কখনও দেখে নাই। ব্যাপারটা আমি কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নিলাম। আর বুঝে পেলাম যে মানুষটাকে একটা বহুতল-ভবনের ছোট একটা ঘরে রেখে আমরা এখন শান্তিনগরের রাতের পথ ধরে হেঁটে চলেছি, মানুষটাকে আমার ভালো লাগতে শুরু করেছে। কেন? কারণ কি? তিনি ছারপোকা পালেন বলে? অহংবোধ বাদ দিলে যে জিনিসটা আমায় স্বীকার করে নিতে হয়েছে, সোজা কথায়, এর মতন মানুষ আমি আগে দেখি নাই। ভাবলাম যে বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে ঘিরে আছে এটা তাকে আলাদা বানাচ্ছে, এটা স্বাভাবিক। আমি অতিরিক্ত কিছু তার উপর চাপাতে নারাজ। সেটার দরকারও নাই। এমন কাউকে বিশ্বাস করার ব্যাপারে আমি ততদিনে ভালো কঞ্জুস হয়ে উঠেছি।

এর তিনচারদিন পর আমি চলে যাই।
আমার এই একমুখী ছোট্ট জীবনে ভাগ্যক্রমে আমি কিছু অমূল্য বন্ধুর সন্ধান পেয়েছি, যাদেরকে শব্দে বাঁধার কোনো ইচ্ছা আমার নাই, ইচ্ছা নাই কোনো জীবনদর্শনের বেল্টে বাঁধার। ব্যাপারটা যোগ্যতার প্রশ্ন নয়, ব্যাপারটা ফিডেলিটির প্রশ্ন। সে যাই হোক, আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগে যে দরজাটা দিয়ে আমি ঢুকেছিলাম, যে শাদাশাদাফর্সা খালি গায়ের লোকটা মেঝের উপর পাতা একটা পাতলা তোষক থেকে উঠে জিজ্ঞেস করছিলেন – আগে বলো জন্মতারিখ কবে? আর হাঃ হাঃ হাসি, সেই লোকটা সেই থেকেই হয়ে উঠতে থাকেন আমার ইমন ভাই। আমাদের ইমন ভাই।

এই ইমন ভাই লিখতেন। লিখতে বলতেন। কবিতা অনুবাদ করতে দিতেন। একবার লিখেছিলেন…

‘আকাশ; এ’কদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। কাজেই লিখতে পারিনি। এখন ব্রডব্যান্ড নিলাম। তখন মোবাইল ইন্টারনেট ইউজ করতাম। সীমাবদ্ধতা ছিল। …আশা করছি এখন থেকে অবিরল যোগাযোগ থাকবে এবং বাংলায় লিখতে পারব এবং আমি বাংলায় লিখতে পছন্দ করি। আর শুনলাম যে তুমি নভেম্বরে চলেই আসছো। ভালো সিদ্ধান্ত।…ভালো। বিদেশ থেকে চলে আসাই ভালো। যারা বিদেশে থাকে তাদের মন শক্ত। শক্ত মন অনেক অনেক সমস্যার তৈরী করে। হয়তো ব্যাংকে ১০ কোটি টাকা আছে। এদিকে একটা মেয়ের বিয়ে ২ হাজার টাকার জন্য আটকে আছে। বিয়ে হবে না। আবার অনেকেই বিদেশে থেকেও টাকা পয়সা দিয়ে বাংলাদেশের গরীব লোককে সাহায্য করে। তা হলে তাদের মন কি শক্ত না? কাজেই কোনও সিদ্ধান্তে আসা যায় না।…
…তারপর কি করবে? সম্ভবত সবচে ইমপরটেন্ট প্রশ্ন এটাই। আমরা আড্ডা দিব। শাহাদাতও থাকবে। তারপর? জীবন দীর্ঘ ও বোরিং। সব স্বপ্ন সফল হয় না।’…

সব স্বপ্ন সফল হয় না – সরল কথাটা একটা বাস্তব কথা। রোমান্টিক মানুষটা তবে বাস্তববাদীও বটে? ভাবতে থাকি। চলে আসি দেশে। জীবন কাটে। আড্ডা দেই। কিন্তু যত ঘনঘন যাওয়ার কথা, কিংবা যাওয়া উচিত, বিভিন্ন কারণে তত যাওয়া হয় না। ‘তোমার বেশিদিন চাকরী করতে পারার কথা না’ – কিন্তু আমি লোভ ছাড়তে পারি না, বাঁচার লোভ। ফাঁকে ফাঁকে লিখতে বলেন। সময় কাটাতে তিনি সামু ব্লগে আসেন। ব্লগের কথা বললেন। এই কম্যুনিটি ব্লগ, হতে পারে একটা ভার্চুয়াল মিডিয়াম, তবে কিনা বাস্তবতার অনেক কাছেই। এই ব্লগে তিনি নামাতে পেরেছেন নিজেকে, সময় কাটিয়েছেন। খেলেছেন। যে ভাব ও চিন্তাধারা তিনি লালন করেছেন, ঘটনাক্রমে কারও কাছ থেকে (নামটা মনে পড়ছে না) এই সামু ব্লগের হদিস পেয়ে তিনি আনন্দিত হয়েছেন, স্বাধীন মানুষটা আরও একটু স্বাধীন হয়েছেন, বাইরের মানুষদের সাথে মেশার সুযোগ পেয়েছেন, যে সুযোগ তার বাস্তবে ছিলো না; পাশাপাশি বাস্তবের মেলামেশার সাইডএফেক্টগুলো বাদ দিয়ে, যেগুলো ডিল করার ইচ্ছা তার ছিলো না। এই ব্লগটাই তার জীবনের শেষকিছুদিন আনন্দের এক জায়গা ছিলো, যেমন আনন্দ আর হাসির খোরাক তিনি জোগাতেন তার দর্শনার্থীদের। তবে আমি বলতে চাই, এইসবকিছুই একটা সূক্ষ্ম পর্দার আড়ালে। যে পর্দার হদিস কে পেয়েছে জানি না। এই পর্দা কোনো মুখোশ নয়, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবে নিজের চারপাশে মুখোশের বলয় নয় এটা, ইমন ভাই মুখোশের ধার ধারেন না, তিনি অকপট। ইমন ভাই কী চান? এটা ছিলো আমাদের নিজেদেরকে করা একটা প্রশ্ন? প্রশ্নটা খুব বড় নয়, এক অর্থে তেমন গুরুত্বপূর্ণও নয়। এটা তার জীবন। ‘শোনো কারও কিস্যু যায় আসে না, তুমি এইভাবে করলা, নাকি ওইভাবে করলা, তাতে আমার কী…আমি তো তোমারে বাঁচাইতে আসবো না, তোমার কিছু হলে কার কী’…ইমন ভাই কী চান? একটা মানুষ কী চায়? এই প্রশ্ন করার সাথে সাথে উত্তরগুলো আমাদের মনে ছায়া ফেলে। নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, প্রকৃত ভাববাদীরা বোধহয় সবচেয়ে বেশী বাস্তববাদী। তিনি একসময় ঘুরেছেন, দেখেছেন। বেশি দেখার প্রয়োজন নেই, কারণ জীবন দীর্ঘ ও বোরিং। একই জিনিসের রিপিটেশান। গম্ভীর ভারবাহী এই জীবনের চাপ আর কোন জায়গার কেমন গন্ধ, তিনি দূরে থেকে কী হারাচ্ছেন, কাছে গিয়ে কী পাবেন, ঘাম গন্ধ স্পর্শ, এইসব কিছু তার হিসেব করা। তার জীবন কী হবে তার হিসেব করা। ইমন ভাইয়ের ইন্টুইশান – এই শব্দগুলো এই জগতের মতই একটা ম্যাজিক অথচ কী ভয়ংকরভাবে অস্তিত্বশীল।

ইমন ভাই, পায়ের এইটা কী অবস্থা
…শোনো, ব্যাপারটা হোলো যে,… (তারপর আধঘন্টার লেকচার)
কিন্তু এইটা তো ভয়ংকর ব্যাপার…আপনার ডায়াবেটিস
…শোনো… (তারপর বিশ মিনিটের লেকচার)
চাপ দেয় শাহাদাত। চেপে ধরে কোনঠাসা করে। ধীরে ধীরে। প্রম্পটলি করলে উনি বেঁকে বসবেন। সামনাসামনি না দেখে তার অবস্থা বোঝার উপায় নাই। ইমন ভাই মুখ ফুটে নিজের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলবেন এটা হবার নয়। শাহাদাত ওষুধ দেয়। ইমন ভাই গুরুত্ব দিয়ে শোনেন। অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন। হাঁটেন। একদিন… ‘ভোরে বেইলী রোদের ঐদিকটায় হাঁটলাম, (চাবাচ্ছেন, চোখ বন্ধ)… কানে আহির ভৈরব’…

জীবন অমূল্য। এটা ইমন ভাইয়ের চেয়ে ভালো আর কে জানে। জীবন অর্থহীন। এটা ইমন ভাইয়ের চেয়ে ভালো আর কে জানে।

একদিন কথা বলার মাঝে কারেন্ট চলে যাওয়ার পর অন্ধকার ঘরে বসে অনেকগুলো কথার মাঝে…’মাঝে মাঝে ব্লিস হয়…চারপাশের এই যে আছে…সমস্যা হয় ঠিকই…এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় তো নাই…কিন্তু এই যে ব্যাপারটা, মাঝে মাঝে ব্লিস হয়…’। তিনি কী চেয়েছিলেন? আবারও নিজেকে জিজ্ঞেস করি। ‘শোনো…একজন গঞ্জের ব্যাপারীর কাছে ইউকের বাঘা বাঘা বিজনেস টাইকুনরাও ব্যবসায়ী বুদ্ধিতে পেরে উঠবে না’ – স্টেইটমেন্টটা হতে পারে সত্য কিংবা মিথ্যা, কথা সেটা নয়, কথা হচ্ছে শব্দউৎসের ভাব। যে ভাব দিয়ে তাড়িত হয়ে তিনি কপিল, গৌতমকে বারবার টেনে আনতে চেয়েছেন এখানে, ইতিহাসের ভিত্তিতে প্রকৃত স্বরূপ খুঁজেছেন, বলেছেন বাঙলাভাবের বীজ থাকাতেই এই মানবেরা পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইমন ভাই বিশ্বাস করতেন এই জনপদের সাধারণ মানুষ ইউনিক, এদের ভাব, প্রকৃতি ও প্রেম অনন্য, এদের অন্যরকম ক্ষমতা আছে। আমাদের ইতিহাস বলি, ঐতিহ্য বলি, যে নামই দেই, গর্ব করার মতন কারণের অভাব নেই আমাদের। অবশ্যই তিনি সীমাবদ্ধতাগুলো জানেন, অবশ্যই তিনি জানেন মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের গিমিকবাজী, আইডেন্টিটির মেকি তাড়ণা। ‘ধৈর্য্য ধরো, চোখের সামনে যা দেখছি, সেগুলো বললে এই হবে…’, বলছেন, ‘এগুলো তো শুধু আমরা জানবো, এগুলো বলার প্রয়োজন নাই…’

সুবিধাবাদী লোভী কুচক্রী সুপারফিসিয়াল অমিতঅহংকারী শয়তান ভণ্ড মানুষদের দুনিয়ায় তাদেরকেই স্বাভাবিক বলে আমরা ধরে নেই। এদের আবার বিভিন্ন মাত্রা আছে। আর প্রকৃত প্রজ্ঞাবান ত্যাগী নিরহংকার নীরব মানুষের ক্ষমতাকে আমরা অস্বাভাবিক বলে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। আমরা এদেরকে দেখে উসখুস করি, মানতে চাই না। জীবনকে চুরি করে ইচ্ছামতন খেলা লোকগুলোকে আমরা এড়িয়ে চলি। এখানেও অনেক মাত্রা। শ্রেণীভেদ আছে। মানুষের ভেদাভেদে বিশ্বাস করা-না-করা থিউরী একজিনিস, আর এদের সাথে জীবন কাটানো আরেক জিনিস। উপরিউক্ত প্রত্যেকটি শ্রেণীর মানুষদের হাড়ে হাড়ে চিনতেন ইমন ভাই। যারা তাকে ব্যবহার করেছে, যারা তার কাছ থেকে নিয়েছে, যারা তাকে অবহেলা করেছে, কষ্ট দিয়েছে, আশ্চর্য হইনা, তিনি সব হজম করেছেন, ভয়ংকর মানসিক শক্তির মানুষটা তাদেরই প্রমোট করেছেন, তাদের নিয়েই থেকেছেন। চামড়া জাতপাত কিংবা উপরের তল দেখে নয়, অন্যদের অন্তর্নিহিত সত্তার ভাব টের পাওয়ার গভীর ক্ষমতাসম্পন্ন এক মানুষ তিনি। অস্তিত্ব আগে, এর এসেন্স পরে। উদ্বেগ, শারিরীক সীমাবদ্ধতা, চারপাশের প্রতিকুল পরিবেশ। ‘মাঝে মাঝে ব্লিস হয়…মাঝে মাঝে…’। তাই যখন তিনি লিখছেন টোলটেক সভ্যতা কিংবা গৌতমের কথা, সুমেরীয় সভ্যতা কিংবা লালনের গুরুদের কথা, রাগ বাগেশ্রী কিংবা জন্মদিনের পোষ্ট, পাঠক, আপনি প্রিটেক্সট জানবেন, এবং ভেবে নেবেন। ভেবে নেবেন কোন অবস্থা থেকে তিনি আনন্দ দিয়েছেন, জ্ঞান দিয়েছেন, হেসেছেন, খেলেছেন। কাঠের একটা চেয়ারে বসে হজম করেছেন সবকিছু। এটা কী সহজ ছিলো? ভাবতে গেলে হয়তো আরেকটু স্পষ্ট হবে, যেরকম তাকে ভেবেছি, তিনি তার থেকেও অনেক বহুমাত্রায় খেলে বেড়ানো এক বহুমাত্রিক মানুষ। সহজ মানুষ। আমি শুধু বলতে চাই, তিনি যদি আরেকটু ঘৃণা করতেন, তিনি বেঁচে যেতেন। তিনি যদি স্বার্থপর হতেন, তিনি বেঁচে যেতেন। ঘৃণার চাষ তিনি করেননি। তিনি কোনোকিছুর চাষই করেননি। কেন তিনি ইমন ভাই, কারণ তিনি সব জ্ঞান, স্কিল, এবং প্রজ্ঞার আড়ালে একজন সহজ ভালোমানুষ, যেটা পাওয়া অসম্ভব। এই অসম্ভবের দেখা আমরা পেয়েছি। আমরা তাই যেতাম। কোনো কিছুর আশায় নয়। কোনো বিশ্লেষণধর্মী দুনিয়া উদ্ধার করা বিশ্লেষণ নয়। সঙ্গ দিতে। একজন বন্ধুর সাথে কথা বলতে। অল্প সময়ের এই জীবনে কিছুক্ষণ পথের সঙ্গী হতে, একসাথে হাঁটতে। ‘শোনো, তোমরা তো আর এখানে ঠিক মিষ্টি খাইতে আসো না তাই না’। ইমন ভাই, একটা ভয়ানক বিশাল উপন্যাস লিখেন। ‘হ্যাঁঞ লিখবো। এইতো লিখবো’। সিরিয়াসলি ইমন ভাই। ‘শোনো সব আবার পড়ে ফেলতেছি’। হেসেছেন, খেলেছেন, চলে গেছেন। আর। আমি। আমরা। খালি। হয়ে। গেছি।

জানুয়ারীর চার তারিখ বিকেলে আমাদের ইমন ভাইয়ের সাথে দেখা করার কথা। তার আগেই সেদিন গভীর রাতে তিনি চলে যান। জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা আমাকে বলেছিলো বন্ধু শাহাদাত। একমাত্র আমিই জানি, আমার এই বন্ধুটি না থাকলে এই চলে যাওয়া আরও আগেই হতে পারতো। এর আগেও ডায়াবেটিক ভয়াবহ হবার আগে একদুইবার সে ওষুধ দিয়ে, রাজি করিয়ে তাকে ফিরিয়ে এনেছিলো। এই শহরে আসলে আর কোনো বড় ডাক্তার কিংবা হাসপাতাল ছিলো না।

“একটি সূর্যাস্তের ঠিক কী মানে? যখন নিস্তেজ মৌন রোদ ছড়ায় শহরের গাছগুলির ওপর; যখন কাকের কোলাহল সেই মৌনতাকে খানখান করে ভাঙ্গতে থাকে; যখন দিগন্তের আলো দ্রুত নিভতে থাকে আর ব্যাপক কুয়াশার ভিতর জড়ানো থাকে একটি রাত্রির ইঙ্গিত; যখন একটি শীত শীত দিনের শেষ বেলাকে কেউ ফিসফিস করে বলে: বিদায়। এই অনুভূতি আমাকে কেমন অবশ করে দেয়। কেননা, জীবন আরও গভীরে গড়াল কিংবা হারাল মহাকালের কিছু মুহূর্তসমষ্টি-যে মুহূর্তসমষ্টি আমি লাভ করেছিলাম জন্মমুহূর্ত থেকেই। সেই মুহূর্তসমষ্টি কি আমার? মহাকালের তরফ থেকে আমাকে সচেতনভাবে দেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নটিই আমাকে বিব্রত করে দেয়। কেননা, আমি দেখেছি অভাবী নারী ফুটপাথে তার শিশুটিকে নিয়ে অনাহারে কাটাচ্ছে অর্থহীন মুহূর্তসমষ্টি; তবে আমি কেন আমার মুহূর্তসমষ্টিকে সুখি ও শিল্পায়িত করার জন্য অহরহ চেষ্টা করব? আমি কেন নিজেকে নির্বাচিত ও বিশেষ ভেবে উৎফুল্ল হয়ে উঠব? এই বোধ আমার স্নায়ূতন্ত্রকে বিকল করে দিতে যথেষ্ট।”

ইমন ভাই…আসি তাহলে
একটু বসো…কেক কাটা হবে…

তিনি ঘর থেকে বাইরে গেলেন। আমরা ভেতরে বসে। ইমন ভাই একটু পরেই ফিরবেন। আমরা অপেক্ষায় আছি। আমরা অপেক্ষায় আছি এমন একটা ঘরে, যে ‘ঘরটায় অনেকগুলি দরজা, একটিই কেবল বেরুনোর পথ’
শোনো… ‘ও দরজাটা বিলক্ষণ চিনি।
একটি দরজা দিয়েই নাকি যাওয়া যায় নিশীথের সূর্যের দেশে
কিংবা অ্যালিসের আশ্চর্য শহরে’
সেই দরজাটাই খুলতে পারছিলাম না এতদিন …

ইমন ভাই কেমন আছেন?
শোনো…’একটাই জীবন। তাই, পাহাড়েই কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম;
তবুও হে সমতল শহর- আমি তোমায় ভালোবাসি বলে
তোমাকে ছেড়ে আমি অরণ্যবাসী হইনি; তোমার সংকীর্ণ গলিতেই
আজও আমার বাস;
যদিও পানছড়ির মৌন পাহাড়শ্রেণি আমাকে ডাকে নিরন্তর
একটাই জীবন যেহেতু- তাই পাহাড়েই কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম
গভীর নির্জনতা আর গাছপালার ঘন গন্ধ ভালোবাসি বলে।

……তবু বলি, হে সমতল শহর- তোমাকে ছেড়ে আমি বেশিদিন
দূরে থাকতে পারি না বলে আমার কোথাও যাওয়া হয় না……

পানছড়ির পাহাড়শ্রেণি আমাকে না-পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললে ফেলুক
বাঁশপাতারা ধরে রাখুক একটি নীল ময়ূরীর কান্নার জলের নোনা ফোঁটা
প্রিয়তম পাঙ্খোগ্রামে নামুক অস্বাভাবিক মৌনতা
পানছড়ির সব ঝর্নার জল যাক শুকিয়ে …
আমি তবুও এ জীবন কাটিয়ে দেব তোমার সংকীর্ণ গলিতে বেঁচে থেকে’…