রহস্য গল্প – পশু

তোমার কি কখনো এরকম হয় যে নিজের ওপর নিজেই ভরসা করতে পারছো না? – চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে টেবিলে রাখতে রাখতে বলল মুনীর।

শারমীন তার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল।

যেমন ধরো তোমার নিজের ওপর নিজেরই কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, যেন অদৃশ্য কোন শক্তি তোমাকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নিচ্ছে – এরকম !

শারমীন এবার হাসল, স্নিগ্ধ সুন্দর হাসি – শুনেছি, এমন হয় জীন বা পরীতে ধরলে – বলল সে।

মুনীর ওর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, মেয়েটা কৌতুক করছে কিনা। শেষে নিশ্চিত হয়ে সেও হেসে ওঠে – তুমি জানো না, আজকাল জীন-ভূতও দোয়া-তাবিজে বিশ্বাস করে না, ওদের মধ্যে অনেকেই এখন নাস্তিক হয়ে গেছে !

শারমীন হেসে ওঠে।

সত্যি বলছি, খুব লজিক্যালি আমি জিনিসটা বোঝার চেষ্টা করেছি। আগে লোকজন মনে করত, বিশেষ কোন সূরা বা দোয়া পড়লে জীন-ভূত দূর হয়ে যাবে। এটা ছিল তাদের অজ্ঞতা। অন্যদিকে জীন-পরীও ছিল যথেষ্ট অজ্ঞ আর কুসংস্কারাচ্ছন। ফলে তারাও মনে করত – দোয়া-তাবিজে হয়তো তাদের কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। দোয়া-তাবিজে তারা যে পালিয়ে যেত, সেটা দোয়া-তাবিজের গুন না, বরং ওটা ঘটত সেসব জিনিসের প্রতি তাদের অমূলক ভয়ের কারণেই। পুরো ব্যাপারটাই সাইকোলজিক্যাল।

বলে মুনীর কিছুক্ষণ আড়চোখে শারমীনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর দুজনই একসংগে হেসে ওঠে।

কিন্তু হঠাৎ করেই মুনীর আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়, বিড় বিড় করে আগের প্রসংগ টেনে বলে – যাহোক, ঠাট্টা করছি না, আমার কিন্তু কয়েকবারই এমন হয়েছে। মনে হয়েছে, আমি যা করছি যেন একটা ঘোরের মধ্যে করছি, যেন দুনিয়া ওলোট-পালোট হয়ে গেলেও আমাকে সেটা করতেই হবে – সাধারণত নিষিদ্ধ কাজ কিংবা ধরো কোন অপরাধ করার সময় এমন হয়।

লিটারেচারে এটাকে বলে নিয়তি, ইডিপাস যে মহাপাপ করবে ওটা ছিল একান্তই তার নিয়তি – শারমীন মন্তব্য করে।

কিন্তু শারমীনের অ্যানালগি মুনীরকে নিশ্চিন্ত করতে পেরেছে বলে মনে হয় না, বরং মেয়েটা তার কথা গুরুত্ব না দেয়াতে তাকে কিছুটা হতাশ বলেই মনে হয়।

ক্ল্যাসিক রহস্যগল্পগুলোতেও এটা আছে, যেমন ডক্টর জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড। তুমিও তো পড়েছ, তাই না ! সেই যে ভদ্রলোক দিনের বেলায় থাকত শান্ত-সুবোধ বিজ্ঞানী জেকিল হয়ে, আর রাতে সেই রূপ বদলে হয়ে যেত দুশ্চরিত্র মিস্টার হাইড। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হলেও এটা কিন্তু মানুষের দ্বৈত স্বত্ত্বার চমৎকার একটা আখ্যান।

মুনীর জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল, মনে হচ্ছিল না – শারমীনের কথাগুলো সে ভালো করে শুনেছে। সেই কখন বিকেলবেলা সে এসেছে এখানে। সন্ধ্যাটা স্রেফ গল্প করে কাটানোর ইচ্ছে ছিল। তারপর সোয়া সাতটা থেকে শুরু হল অবিরাম বৃষ্টি, এখনো বৃষ্টি হচ্ছে – প্রচন্ড বৃষ্টি, মনে হচ্ছে পুরো শহরটা যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। শারমীন চানাচুর-মুড়ি মাখিয়ে এনেছে, সাথে চা। চমৎকার আয়োজন, কিছুটা নস্টালজিকও। কিন্তু মুনীর বুঝতে পারছে না, আজকে কিভাবে এখান থেকে বের হবে। বারান্দায় উঁকি দিয়ে সে দেখল, সামনের গলিতে এক হাটু পানি জমে গেছে।

অবশ্য সময়টা একদম মন্দ কাটছে না। শারমীনকে এখনো তার সেই কলেজের দিনগুলোর মতই লাগে। সেই সময় এক বার্ষিক পুরষ্ড়্গার বিতরণী অনুষ্ঠানের দিন শারমীন লাল পাড় লাগানো সাদা শাড়ী পরে কলেজে এসেছিল। মুনীর বোকার মত হা করে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে, শারমীন সেটা লক্ষ্য করে মিটিমিটি হাসছিল। মুনীর একরাতে শারমীনকে স্বপ্নেও দেখেছিল – সেই সময় – শারমীন যেন একটা সাদা পরী, আর তার সাদা শাড়ীর আঁচলটা ডানা হয়ে গেছে। আশ্চর্য, সেই স্বপ্নের কথা মুনীরের এখনো মনে আছে !

সিরিয়াস, তুমি কোন পীর-ফকির দেখাও – শারমীনের মন্তব্যে ও বর্তমানে ফিরে আসে।

পীর-ফকির? পীর-ফকির কেন? – মুনীর স্পষ্টতই অবাক হয়।

যদি তোমার ওপর জীন-পরীর কোন আসর থাকে, তাহলে তারা এর বিরুদ্ধে কোন তদবির বলে দেবে।

মুনীর মাথা নাড়ে – ভালোই বলেছ। ও, তোমাকে তো সেই ঘটনা বলা হয় নি, সেদিন দুই-তিনজন মৌলভী এসেছিল আমাদের অফিসে। আমার সাথে রীতিমত তর্ক। তুমি তো জানো, পেশাগতভাবে আমার কাজ মৃত্যুদন্ড ধরনের বড় শাস্তিগুলো রোধ করার ব্যাপারে জনসচেতনতা তৈরি করা। আর শুধু পেশার জন্য না, আমি ব্যক্তিগতভাবেও এটা বিশ্বাস করি। দেখ, এই যুগে এসে মৃত্যুদন্ডের মত পাশবিক আইনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার কোন মানেই হয়না। চুরির জন্য হাত কেটে ফেলা, রক্তের বদলে রক্ত, বিয়ের বাইরের সম্পর্ক এমনকি যদি সেটা দুর্ঘটনাবশতও হয় তার জন্য পাথর ছুড়ে হত্যা করা – এসবের কথা এই আধুনিক যুগে এসে চিন্তা করা যায় ! তো আমরা ঐ এলাকায় এরকম একটা মতবিনিময় সভাই করছিলাম। তারা সভার পর আলাদাভাবে আমার সাথে দেখা করল। তারা অনেক কথাই বলল, সত্যি কথা বলতে কি – পরোক্ষভাবে হুমকিই দিল আমাদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে। তো তারা যা বলল তার মূল কথা হল – মানুষ যেহেতু একইরকম আছে, কাজেই আইন বদলানোর কোন দরকার নেই। চিন্তা করেছ !

এরা তাই বলে নাকি?

ধর্মের প্রতি আমার কোন বিতৃষ্ণা নেই, বরং ধর্মের ভালো শিক্ষাগুলোকে সমাজ নৈতিকতার একটা মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়াশীল অংশগুলো থেকে মুক্তি না পেলে সমাজকে এগুলো কেবল পিছিয়েই দেবে। তাই না?

শারমীন মাথা নাড়ে।

এরা আরো কি বলে, জানো? এরা বলে – যেহেতু সমাজে এখনো ধর্ষণের মত জিনিস আছে, যেহেতু মানুষ এখনো দুর্বলকে অত্যাচার করে, একে অন্যকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে, সেহেতু মানুষ সভ্য হয়েছে এমন দাবী করা যায় না। তুমি চিন্তা করতে পারো তাদের অবস্থা ! এই আইনগুলো নাকি হয়েছিল মানুষের শরীরের জন্য – আর মানুষ নাকি আজো সেই মধ্যযুগের মতই শারিরীক রয়ে গেছে। ধর্মের উদ্দেশ্য নাকি ছিল, এই আইনগুলোর প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের আত্মাকে শরীরের উর্ধ্বে উত্তীর্ণ করা। যেহেতু আমরা তা করতে পারি নি, সেজন্য ধর্মীয় আইন তুলে দিতে বলা হবে অন্যায়। কি আশ্চর্য, না!

শারমীন আবারো মাথা নাড়ে।

হ্যাঁ, আমি মানি – একটা সময় ছিল আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে, যখন এসব আইনের প্রাসংগিকতা হয়তো ছিল। কিন্তু এখন যুগ বদলে গেছে, এখন যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগুলোও পাল্টাতে হবে।

তা এগুলো যে এ লোকগুলোকে আমরা বোঝাতে পারছি না, এটাতে নিশ্চয়ই আমাদেরও কোথাও দায়িত্বে অবহেলা আছে – মুনীরের দীর্ঘ বক্তৃতায় এবার বাধা দেয় শারমীন।

দেখ শারমীন, যে ঘুমিয়ে আছে তাকে ডেকে তোলা যায়, কিন্তু যে ঘুমের ভান করে আছে তাকে জাগানোর কোন উপায় আমার জানা নেই – মুনীরের কণ্ঠে হতাশা ঝরে পড়ে।

মুনীর আবার জানলার বাইরে তাকাল। বৃষ্টি কমার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মুনীর সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়ে। ওর বাসা এখান থেকে প্রায় এক ঘন্টার রাস্তা। সে যদি ঠিক এই মুহূর্তেও বের হয়, তবুও এই বৃষ্টিতে রিক্সা পেতে যথেষ্ট কষ্ট হবে বলেই তার ধারণা। আর রাত বেশি হলে তো কথাই নেই। বেশ শীত শীতও লাগছে তার, বৃষ্টিতে ভিজতে একদম ইচ্ছে করছে না। এদিকে এখানেই বা কতক্ষণ থাকা যাবে !

শারমীন এ বাসাটায় বলতে গেলে একাই থাকে। জহুরুল ভাই প্রায়ই ঢাকার বাইরে কাজে যায়, কি একটা এনজিওতে কাজ করে ভদ্রলোক। জহুরুলও মুনীরকে বহুদিন ধরে চেনে, শারমীনের সাথে তার বন্ধুত্বকে ভদ্রলোক বেশ সম্মানের দৃষ্টিতেই দেখে।

ভালো কথা, তুমি কি তোমার সেই সাময়িকভাবে স্মৃতি হারানোর ব্যাপারটার কারণ বের করতে পেরেছ? – হঠাৎই শারমীন জিজ্ঞেস করে।

কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকে মুনীর, যেন বেশ চিন্তা করে উত্তরটা বের করে সে – ও, সেই ঘটনা, হ্যাঁ, একজন সাইকায়াট্রিস্টের সাথে কথা বলেছি আমি। মনে হয়, এটা একধরণের অ্যামনেসিয়াই।

তাই ? – শারমীন বলে – কিন্তু সে ব্যাপারটা কি উনি বের করতে পেরেছেন, কেন শুধু বিশেষ একটা জায়গায় এসেই এটা হচ্ছে?

মুনীরকে আবার একটু অন্যমনস্ক মনে হয়, তারপর যেন একটু দ্বিধা নিয়েই সে বলে – আসলে, সত্যি কথা বলতে কি, এটা ঠিক সেভাবে বের করা যায় নি। হয়তো এটা একটা কো-ইনসিডেন্সই।

আমার কিন্তু তা মনে হয় না – শারমীন যেন কথাটা হঠাৎ একটু জোর দিয়েই বলে।

মুনীর কি একটা চিন্তায় ডুবে যায় আবার – অন্যমনস্ক।

গত মার্চ মাসে প্রথম ঘটে ঘটনাটা। মুনীর আড্ডা মারতে এসেছিল শারমীনের এখানে। লোড শেডিং আর ভ্যাপসা একটা গরম ছিল। ওরা দুজন সন্ধ্যার পর ছাদে চলে গিয়েছিল গল্প করার জন্য। মুনীরের এপর্যন্ত মনে আছে, কারেন্ট আসার পর ওরা নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু এরপর আর কিছু তার মনে নেই। পরদিন সকালে ঘুম ভেংগে দেখে, সে শারমীনদের ড্রইংরুমে শুয়ে আছে। মাঝখানে সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো – অস্পষ্ট।

সে শারমীনকেও জিজ্ঞেস করেছে – সেরাতে কিভাবে সে জ্ঞান হারাল, কোন খিঁচুনি হয়েছিল কিনা, গায়ে জ্বর ছিল কিনা, ইত্যাদি। কিন্তু সেও পরিস্কারভাবে কিছু বলতে পারেনি।

পরের বার একইরকম একটা ঘটনা ঘটে প্রায় মাস তিনেক পর, জুনের শেষ দিকে। সেবারও সন্ধ্যার পর কথা বলছিল সে শারমীনের সাথে, তারপর হঠাৎ করেই তার কোন স্মৃতি নেই। সকালে মুনীর আবিস্কার করে – সে শারমীনের বিছানায় শুয়ে আছে। অসুস্থ হয়ে পড়ে পড়ে বার বার বান্ধবীকে বিপদে ফেলে দেয়ায় সে যারপরনাই লজ্জিত হয়েছিল।

অথচ মাঝখানের কয়েকমাসে সে বেশ কয়েকবারই এসেছে এ বাসায়, এরকম ঘটনা হয়নি একবারও। এদিকে শারমীন তার কোন রোগের লক্ষণ গোপন করছে না তো ? সে কষ্ট পাবে ভেবে ? মুনীরের মনে একটা খটকা থেকেই যায়।

তা তোমার কি মনে হয়? – মুনীর জিজ্ঞেস করে।

শুধু এ বাসায় এসেই কেন তোমার ঐ স্মৃতি হারানোর অসুখটা হচ্ছে? তোমার মাথায় এ প্রশ্নটা একবারও আসে নি? আশ্চর্য !

মুনীর চুপ করে থাকে – সে নিজেও এটার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ বের করতে পারে নি। দ্বিতীয়বার ওরকম ঘটার পর এক সাইকায়াট্রিস্টের সাথেও সে কথা বলেছিল। ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন – তার এমন কোন অভ্যাস আছে কিনা যা তাকে প্রচন্ড আকর্ষণ করে কিন্তু সেটা আবার অনৈতিক। সে এর কোন সদুত্তর দিতে পারেনি, কারণ এরকম কোন কিছুর কথা তার নিজেরও জানা নেই। ডাক্তার এরপর তাকে একটা অষুধ খেতে দিয়েছেন, আর বলেছেন – এ অষুধ তার নিজের ভেতরের গোপন অনুভূতিগুলো বাইরে নিয়ে আসতে সাহায্য করবে, তখন সে নিজেই বুঝতে পারবে – কেন কি হচ্ছে। সে গত একমাস ধরে ওষুধগুলো খাচ্ছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত সে দু রাতের কোন গোপন কথাই তার মনের অতল গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসেনি।

আমার একটা জিনিস মনে হয়, জানো – শারমীন হঠাৎ করেই বলে – আমার প্রায়ই মনে হয়, তোমাদের পুরুষদের কাছে শরীরটাই সব। এমনকি হয়তো মেয়েদের কাছেও তাই – সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্যটা শারিরীক, ঠিক যেমনটি ফ্রয়েড বলেছিল।

মুনীর কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে – শরীরকে অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু ওটাই সবকিছু নয়।

শারমীন অবজ্ঞা ধরণের একটা হাসি হাসে – দেখ, প্রেম নিয়ে কত কাহিনী লেখা হয়েছে, কত নাটক, কত কবিতা ! অথচ জিনিসটা জৈবিক চাহিদার প্রাথমিক একটা ধাপ ছাড়া কিছুই না। সামাজিকতার প্রভাব সেই জৈবিকতাকে একটা ভদ্র রূপ দেয় মাত্র, আর তখন আমরা তাকে বলি প্রেম। আচ্ছা, সত্যি করে বল তো, আমার সাথে তোমার সম্পর্ক কি শুধুই বন্ধুত্ব? – ওকে হঠাৎ গম্ভীর মনে হয়।

মুনীর একটু অবাক হয়, কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে – আমার তো ধারণা ছিল, এ ব্যাপারটা বহু আগে থেকেই পরিষ্ড়্গার।

তারপর কি ভেবে বলে – দেখ, আমার মনে হয়, আমরা একজন অন্যজন থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে ভালোই করেছি।

শারমীনের প্রশ্নবোধক দৃষ্টি লক্ষ্য করে সে যোগ করে – বিবাহিত সাধারণ একটা জীবনের কথা ধর, একটা জৈবিক চক্র ছাড়া এর ভেতর আর কিছু তো থাকতে পারে না। তাই না?

মেয়েটা হাসে।

কিন্তু তোমাকে আমি একেবারেই আলাদাভাবে দেখি – হেসো না, আমি খুব ছোটবেলা স্বপ্নে একটা পরী দেখেছিলাম। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে – তুমি আমার জীবনের সেই পরী। জৈবিকতার উর্ধ্বের প্লেটোনিক একরকম অনুভূতি এটা, বিশ্বাস কর।

শারমীন তখনো হাসছিল, কিন্তু মুনীর ওর সে হাসির অর্থ উদ্ধার করার কোন চেষ্টা করল না।

যাহোক, আমার কিন্তু মনে হয়, সেই দুই রাতের ঘটনা আমাকে তুমি কখনোই পুরোপুরি বলনি – হঠাৎ করেই সে শারমীনকে বলে – পরিস্কার করে বল তো, আমার আসলে কি হয়ে ছিল।

আশ্চর্য, তুমি এভাবে কথা বলছ কেন ? আমি কি তোমার প্রতিপক্ষ ? – একটু থেমে তারপর সে আবার বলে – দেখ মুনীর, আমি তোমার রহস্যটার সমাধান বের করতেই চেষ্টা করছি – তুমি প্লীজ এটা বুঝতে চেষ্টা কর।

মুনীর চুপ হয়ে যায়।

আমি তো তোমাকে বলেছিই, সে দুই রাতে তোমার অদ্ভুত একটা কিছু হয়েছিল। এমন কিছু, যা আমার পক্ষে ঠিক ব্যাখ্যা করে বোঝানো সম্ভব না।

কেন ব্যাখ্যা করে বোঝানো সম্ভব না ?

আর তাছাড়া সেটা বললেও তুমি বিশ্বাস করবে না।

বিশ্বাস করব না মানে ? তার মানে আসলেও তুমি সবকিছু বলনি আমাকে ?

এবার শারমীন চুপ হয়ে যায়।

প্লীজ আমাকে সব খুলে বল, আমি এটা নিয়ে খুবই টেনশানে আছি – মুনীর প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে।

খুলে বলার কিছু নেই – শারমীনকে তখন একটু যেন ধাতস্থ মনে হয় – টেনশন করার মত কিছু হয় নি, এটুক বলতে পারি।

ও একটু শ্বাস নেয় – তবে আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব, সেগুলোর ঠিক ঠিক উত্তর দেবে। তারপর আমি যদি কিছু কথা বলি, সেটা মন দিয়ে শুনবে।

মুনীর আবার চুপ হয়ে যায়।

তুমি আমাকে বল, তুমি কি অদ্ভুত কোন স্বপ্ন দেখ? একই ধরনের স্বপ্ন? বার বার?

মুনীর মাথা ওঠায় – তুমি কি করে জানো?

ধারণা করছি – ওকে বেশ সিরিয়াস মনে হয় – আচ্ছা, সেটা কি ধরণের স্বপ্ন ?

দেখি, আমি যেন একটা বাঘ হয়ে গেছি। বাঘ হয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। প্রায়ই দেখি এটা। কিন্তু তুমি এসব জানো কি করে ? – মুনীর সত্যিই অবাক হয়।

যদি বলি আমিও একই স্বপ্ন দেখি – শারমীনকে হঠাৎ বেশ গম্ভীর মনে হয়।

ও, তুমিও কি স্বপ্নের ভেতর বাঘ হয়ে যাও নাকি? – মুনীর এবার অল্প অল্প হাসে।

বাঘিনী – শারমীন ঠিক করে দেয়। মুনীর এবার জোরে হেসে ওঠে।

বাইরে বৃষ্টি মনে হচ্ছে আরো বেড়ে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে শারমীন ওর পাশে এসে বসল। হঠাৎ করেই যেন পরিবেশটাও তখন বদলে গেল।

তুমি ওয়্যারউলফের কথা শুনেছ? – শারমীন জানতে চায়।

ওয়্যারউলফ? সেটা আবার কি?

ওয়্যারউলফ মানে নেকড়েমানব। আশ্চর্য ! তুমি আসলেও জানতে না? পৃথিবীর অনেক মানুষই পূর্ণিমার রাতগুলোতে বাঘ হয়ে যায়। ইংরেজীতে বলে ওয়্যারউলফ, বাংলায় চন্দ্রাহত – বলে ও রহস্য করে হাসতে লাগল।

তা তুমি এগুলো জানো কি করে? – মুনীর এবার উল্টো প্রশ্ন করে তাকে।

আদিকাল থেকেই এসব নানা কাহিনী প্রচলিত আছে পশ্চিমা দেশগুলোতে।

মুনীর মাথা নাড়ে – তুমিই ভালো জানো, তুমি লিটারেচারের ছাত্রী।

আর তাছাড়া··· বলে হঠাৎ থেমে যায় শারমীন।

তাছাড়া কি?

তাছাড়া···মধ্যরাতের বেশি বাকী নেই।

মধ্যরাতে কি হয়? মধ্যরাত ছাড়া কি ওয়্যারউলফ হওয়া যায় না?

অবশ্য তুমি মনে হয় ব্যাপারগুলো এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারো নি – শারমীন বলে।

কি বুঝতে পারিনি? – মুনীর জানতে চায়।

কোন কোন রাতে যে তুমিও সেরকম হয়ে যাও !

তুমি কি করে নিশ্চিত হলে, আমি কোন কোন রাতে সেরকম হয়ে যাই?

তুমি বলেছিলে, প্রায়ই তুমি বাঘের স্বপ্ন দেখ। সত্যি বলছি, আমিও দেখি। সব নেকড়েমানবরাই এরকম স্বপ্ন দেখে।

আর তাতেই প্রমাণ হয়ে গেল যে আমি নেকড়ে মানব – মুনীর হো হো করে হেসে ওঠে – আর তুমি নেকড়েমানবী ?

শারমীন কিন্তু একটুও হাসে না, প্রায় শোনা যায় না এরকম ফিসফিস করে সে বলে – ঐ দুরাতে আমি তোমাকে তাই হয়ে যেতে দেখেছি।

মুনীরের হাসি আরো বেড়ে যায় একথা শুনে।

শারমীন কিন্তু তখনও হাসে না, সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে মুনীরের চোখের দিকে। মুনীর যখন একটু একটু অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছে, তখন শারমীন হঠাৎই তার গায়ে একটা খামচি বসিয়ে দিল – একেবারে অপ্রত্যাশিতরকম আকস্মিক। মুনীর প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও অল্পসময়ের ভেতর নিজেকে সামলে নিল। কিন্তু তখন মেয়েটা তার গলায় কামড় বসিয়ে দিল, ঠিক যেভাবে নেকড়ে তার শিকার কামড়ে ধরে।

আর ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা। হঠাৎ করেই মুনীরের মনে হতে শুরু করল – তার শরীরে যেন কিছু একটা পরিবর্তন আসছে। মনে হতে লাগল – ওর শরীরের লোমগুলো পশুর লোমের মত বড় বড় হয়ে যাচ্ছে, আর দাঁতও যেন মুখ থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে – ঠিক একটা নেকড়ের মত।

মুনীরের তখন কাকতালীয়ভাবে আরেকবার সে অনুভূতিটা হল – নিজের ওপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। হঠাৎ করেই শারমীনকে ওর একটা চমৎকার শরীর বলে মনে হতে লাগল। শারমীনকে নিজের বাহুর মধ্যে জড়িয়ে ধরা মাত্র মাতাল একটা অনুভূতি তাকে গ্রাস করল।

তার চেতনা তখনো পুরোপুরি কাজ করছিল, ফলে সে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিল – সে একটা ভুল কাজ করতে যাচ্ছে, যার মূল্য সম্্‌ভবত একটি সুন্দর বন্ধুত্ব। কিন্তু সাথে সাথে সে এটাও বুঝতে পারছিল, এখন এ ঘটনাটি ঠেকানো তার পক্ষে আর কোনভাবেই সম্ভব না। সে যা করতে যাচ্ছে, সেটা তাকে করতেই হবে – এর মূল্য যাই হোক না কেন।

পুরোপুরি ভিন্ন একটা জীবে রূপান্তরিত হবার ঠিক আগে, মুহূর্তের ভগ্নাংশের ভেতর, মুনীরের মনে বেশ কিছু চিন্তা খেলে গেল – হয়তো নেকড়েমানব কিংবা জীন-পরীর লোককাহিনীগুলো একেবাবে মিথ্যে নয়; হয়তো সত্যি সত্যিই কিছু মানুষ পূর্ণিমার রাতগুলোতে বাঘে পরিণত হয়; এমনকি হয়তো মূর্খ মৌলভীগুলোর কিছু কিছু কথাও ঠিক – কোন কোন প্রাচীন আইন হয়তো সেসব লোকের জন্য খারাপ হতো না, যারা মাঝে মাঝে পশু হয়ে যায়।

বিশেষ করে মৃত্যদন্ডের কথা মুনীরের আলাদা ভাবে মনে পড়ল, মনে পড়ল এজন্য যে – তার মনে হচ্ছিল, সে নিজেও একটা পশুর শরীরে আটকা পড়েছে, আর মৃত্যু ছাড়া এর হাত থেকে মুক্তির অন্য কোন উপায় সম্ভবত নেই।