রোমাঞ্চ গল্প – ফ্রিক

টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। এরকম বৃষ্টি আমি মোটেও সহ্য করতে পারিনা। কি দরকার এভাবে বৃষ্টি হবার? না প্রকৃতি ভিজতে পারে, না ঠিকমত শ্বাস নিতে পারে! ভাবছিলাম অফিসে যেহেতু কাজ নেই, আজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরব। কিন্তু আটকে গেলাম। সাদ এর সাথে হাসপাতালে আসতেই হল। ওর চাচা অসুস্থ। লিভার সিরোসিস হয়েছে ওনার। ওনাকে দেখতেই আসা। সাদ আমার কলিগ। অফিসে একমাত্র ওর সাথেই আমার খাতির বেশি। তাই মানা করতে পারলাম না। আমি পারত পক্ষে হাসপাতালে আসি না। ভাল লাগে না। ছোটবেলায় একবার টানা একসপ্তাহ থাকতে হয়েছিল নানীর সাথে। তখন থেকেই হাসপাতাল সহ্য করতে পারিনা। বিশেষত ওষুধ আর অ্যান্টিসেপটিকের যে কড়া গন্ধটা থাকে, সেটা একেবারেই অসহ্য লাগে। সাদ’র চাচা কে আই সি ইউ তে রাখা হয়েছে। আমাদের অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখার পর এই মাত্র অ্যালাও করল ভেতরে। আমি আর সাদ ভেতরে ঢুকলাম। নানান রকম যন্ত্রপাতি লাগান রোগীর শরীরে। বেশকিছু যান্ত্রিক আওয়াজ হচ্ছে। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। মনের ভেতর কে যেন বলে উঠলঃ উনি আর বাঁচবেন না!

মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। আমি সাদ কে ডেকে বললাম, “বাইরে আয়। তোর চাচা এখন মারা যাবেন।” সাদের স্তম্ভিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে দরজা ঠেলে বাইরের বারান্দায় চলে এলাম। দম আটকে আসা একটা অনুভূতি হচ্ছে। বাইরের ভেজা বাতাসটায় একটু তবুও অক্সিজেন পাব! কিছুক্ষণ পর খবর এল, উনি মারা গিয়েছেন।

সাদ প্রচন্ড অবাক হয়ে গেছে। ও আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছে এটা বুঝতে পারছি। কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় ও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। এটাই সময়। সাদ কে হসপিটালে রেখে বেড়িয়ে পড়লাম আমি।

আমার একটা ক্ষমতা আছে। আমি অন্তত ক্ষমতাই মনে করি। কোন কিছু গেস করে বলে দিতে পারি আমি। ভবিষ্যতে কি হবে তাও বলতে পারি। প্রথমে যখন বিষয়টা খেয়াল করি, মনে করেছিলাম চিন্তাগুলো হঠাত হঠাত মেলে হয়ত। পরে দেখলাম সব সময়ই মেলে। কখনো ভুল হয়না। তবে এখানে একটা ব্যপার আছে। আমার ক্ষমতাটা আমার আয়ত্ত্বাধীন না। মানে যা খুশি তাই বলে দেব আর সেটা সত্যি হয়ে যাবে, এরকম কিছু না। আমি হুটহাট করে যা খুশি তাই বললেই হবে না। ব্যপারটা মন থেকে আসতে হবে। এই যেমন একটু আগে হসপিটালে ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল কথাটা। ওরকম। নিজে ইচ্ছা করলেই যা খুশি ঘটাতে পারি না আমি। সে অর্থে আমার ক্ষমতাটা খুব একটা ভয়ঙ্কর না! কিন্তু একটু পর কি ঘটবে তা আমি আগে থেকেই জানতে পারি। গেস করে বলে দিতে পারি অনেক কিছু। এটাই বা কম কিসে। কেউ যখন মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে তার কোন ক্ষমতা আছে, তখন প্রকৃতি নাকি তাকে সেই ক্ষমতা সত্যিই দিয়ে দেয়। এমনটা আমি বিশ্বাস করি! আমি ক্ষমতাবান! ভাবতে ভালই লাগে!

এই ক্ষমতা আমার অনেক উপকারে এসেছে। কোনটা রেখে কোনটা বলব? যে মোটা বেতনের চাকরীটা করছি, নিজের যোগ্যতায় পাইনি সেটা আমি। পেয়েছি এই অদ্ভুত ক্ষমতার জোড়ে। অল্প বয়সেই গাড়ি-বাড়ি হয়েছে। জীবনে যা যা চেয়েছি মোটামুটি সবই পেয়েছি। সবই কোন না কোনভাবে এই ক্ষমতাবলে!

অনেক খারাপ ব্যপারও ঘটেছে। এই যেমন একটু আগে একটা ঘটল। এরকম আরো অনেকবার হয়েছে। কাউকে প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ দেয়া যে কত কষ্টকর! কিন্তু আমি চাইলেই তো কিছু করতে পারব না। আমার হাতে কিছুই নেই! আমি শুধু বার্তাবাহক।

এইতো কিছুদিন আগেই এক কাছের বন্ধুর সাথে তুমুল ঝগড়া! ঝগড়ার কারণ? তেমন কিছু না ইন্ডিয়া-ইংল্যান্ডের ক্রিকেট খেলা চলছিল, একসাথে বসে দেখছিলাম। আমি হঠাত করেই বলে বসলাম, আর তিন বলের ভেতর ধোনি আউট হয়ে যাবে। দ্বিতীয় বলে ধোনি কট অ্যান্ড বোল্ড। ও বেটিংয়ে টাকা ধরেছিল, ধোনি সেঞ্চুরী করবে। আমি জানতাম সেটা। তুমুল ঝগড়া বেধে গেল বন্ধুর সাথে। ওর কথা হল আমি বলেছি বলেই নাকি ধোনি আউট হয়েছে। এটা সম্পুর্ণ আমার দোষ। আর আমি ইচ্ছা করেই কাজটা করেছি! ও জানত আমার এই ব্যাপারটা। বোঝাতে চেষ্টা করলাম অনেক। লাভ হলনা। শেষে রণে ভঙ্গ দিয়ে ওর বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম।

কাছের বন্ধুরা, যারা ব্যাপারটা জানে অথবা আঁচ করতে পেরেছে, তারা সবাই আমাকে সমীহ করেই চলে। অনেকে অবশ্য অমূলক একটা ভয় নিয়ে এড়িয়ে চলে আমাকে। আর অনেকে দেবতাতূল্য জ্ঞান করে! যদিও আমি মোটেও সেরকম কিছু না। আড়ালে হয়তবা আমাকে ফ্রীক বলে ডাকে। তাতে কি এসে যায়? ব্যাপারটা উপভোগই করি আমি! যেকোন কাজেই আমার ক্ষমতা আমাকে সাহায্য করে যাচ্ছে। সবচেয়ে কাছের বন্ধুও এভাবে পাশে থাকত কিনা আমি জানি না!

ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। কারের স্টিয়ারিং হাত থেকে ছুটে গিয়েছিল। আরেকটু হলেই সামনের গাড়িটার সাথে ধাক্কা লাগত। শেষ মূহুর্তে সামলে নিতে পারলাম। ঠিক তখুনি চোখে ভেসে উঠল একটা দৃশ্য- আমি বাসার কিচেনে চিৎ হয়ে পড়ে আছি। আমার হাতে রক্ত। আমি অনুভব করলাম, বুকের নিচটায় ক্যামন যেন ব্যথা! আর খুব তেষ্টা পাচ্ছে… আচ্ছা আমি কি মারা যাচ্ছি নাকি!

কিন্তু আমিতো ঠিকই আছি। এটা ক্যানো দেখলাম? যাহোক। বেশি পাত্তা দেয়ার সময় নেই। আজ একটা স্পেশাল দিন। এজন্য অফিস থেকে আগে বেরোতে চেয়েছিলাম। সেটা তো হল না। সন্ধ্যা পার হয়ে গ্যালো। অফিসের নিচেই ফ্লাওয়ার প্যালেস নামে একটা দোকান হয়েছে নতুন। ওখান থেকে আসার সময় একগাদা গ্লাডিওলাস নিয়ে এসেছি। অনেক রঙের। বাহারি এই ফুলগুলো শাহরিনের খুব পছন্দ। ওহো! শাহরিন কে এটা বোধহয় বলা হয়নি তাইনা? শাহরিন হচ্ছে আমার সোলমেইট। সোলমেইট! এখন আর কেইবা বিশ্বাস করে… আমি যদিও করি। তো গ্লাডিওলাস হল ওর প্রিয় ফুল। গোলাপ অপছন্দ! কোন মেয়ের কি গোলাপ অপছন্দ হতে পারে? অদ্ভুত না?

শাহরিন কিন্তু আমার ক্লাসমেট ছিল। একই কলেজে পড়তাম আমরা। ও অনেকটাই রিজার্ভড মন মানসিকতা নিয়ে চলাফেরা করত। প্রথম প্রথম তো কথাই বলত না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি বন্ধু হিসেবে ক্লোজ হতে। ও মোটেও সুযোজ দেয়নি। ওর এই উদাসীনতাই আমাকে ওর প্রতি আরো দুর্বল করে ফেলেছিলো। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবু ওকে বোঝাতে পেরেছিলাম, আমার চেয়ে ওকে আর কেউ বেশি ভালবাসতে পারবে না। কিভাবে? সেটা তো অনেক বড় কাহিনী! তবে এটুকু বলতে পারি, আমার গেসিং পাওয়ারটা এক্ষেত্রে দারুণ কাজে দিত! ফোনে কথা বলতে বলতে কাউকে যদি আপনি নিখুঁত ভাবে তার পরিধেয় পোশাক সম্পর্কে বলে দিতে পারেন, অথবা তার পোষা বেড়াল টা কখনো না দেখেই যদি সেটার রঙ বলে দিতে পারেন, তবে সেই মানুষটি কিন্তু স্বভাবতই আপনাকে আলাদা দৃষ্টি তে দেখবে। আর দশজনের সাথে আপনাকে তুলনা করবে না। আর আস্তে আস্তে আপনার প্রতি তার আগ্রহও যে জন্মাবে এটাও খুব স্বাভাবিক! I made everything just perfect for her! কারণ আমি জানি ও কি চায়!

আজকের দিনটা স্পেশাল কারণ আজকের এই দিনেই ৩ বছর আগে আমি ওকে প্রথম শাড়িতে দেখেছিলাম। আর আজকের দিনেই প্রপোজ করেছিলাম। আজকেও সব কিছুই পারফেক্টলি প্ল্যান করেছি। একটা লং ড্রাইভ। ড্রাইভ শেষে অ্যাটরিয়ামে ডিনার। ওর খুব ফেভারিট রেস্ট্যুরেন্ট। এরপর স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানিয়ে দেয়া ডায়মন্ড রিংটা ওকে পড়িয়ে দেব। আর এ সব কিছুই ওর ভাল লাগবে এটা আমি ভাল করেই জানি!

গাড়ি পার্ক করে সিঁড়ি ভেঙ্গেই উঠতে লাগলাম। আমার অ্যাপার্টমেন্ট সিক্সথ ফ্লোরে। কিন্তু লিফটের জন্য অপেক্ষা করার তর সইছে না। এমনিতেই দেরী করে ফেলেছি। “পারফেক্ট” সময়টা ছিল বিকেলে।

কলিং বেল বাজালাম। দরজা খুলল শাহরিনই। ওকে যেন একটু মলিন মনে হল! আমার দেরী হয়েছে তাই? ওর পরনে গাঢ় নীল সিল্কের শাড়ি। গতকালই কিনে এনেছি। ওকে ছবির মত সুন্দর লাগার কথা ছিল। কিন্তু কি যেন একটা বিষাদ ওর চোখে মুখে! “একটু লেট করে ফেলেছি জান! চল, যাবিনা?” ও একটু হাসল শুধু। “চল।” ছোট্ট করে বলল শুধু।

সারাটা রাস্তা শাহরিন আমার সাথে একটা কথাও বলল না! ডিনারের পর ওকে রিং টা পরিয়ে দিলাম। ওর অনেক অবাক হবার কথা ছিল। কিন্তু ওর চোখে তার ছিটেফোঁটা দেখলাম না আমি! আমি কি ভুল করলাম কোন কিছু?

ফিরতে রাত হল। সাড়ে এগারোটা বাজে এখন। বাসায় ফিরেই সোজা চেঞ্জ করতে চলে গেল শাহরিন। কি ব্যপার? কি হয়েছে? ও কি কোন কারণে রাগ করেছে আমার উপর? আশ্চর্য্য! আমার গেসিং পাওয়ার গেল কই? সব ভোঁতা হয়ে গেল নাকি?

শাহরিন রুমে আসতেই ওকে কাছে টেনে নিলাম। “কি হয়েছে তোর?” আমরা এখনো একে অপরকে তুই করে বলি। ও এক ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল!

“আচ্ছা সন্ধ্যা থেকে দেখছি, এরকম করছিস কেন তুই? আমার কোন কাজে কি তুই কষ্ট পেয়েছিস?” শাহরিন নিরুত্তর। “আমি তো সব কিছুই পারফেক্টলি করতে চেয়েছিলাম!…” আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে শাহরিন নীচু গলায় বলে উঠল “এভরিথিং ওয়াজ পারফেক্ট… যাস্ট কমপ্লিটলি পারফেক্ট। এত পারফেক্ট যে কোন মানুষের পক্ষে করা অসম্ভব!”
“মানে! কি বলতে চাইছিস তুই?” ওর জ্বলন্ত চোখ আমি ঠিকই দেখতে পাচ্ছিলাম।

ক্লজিট থেকে একটা ডায়েরী বের করে আমার দিকে ছুড়ে দিল শাহরিন। ওহ মাই গড! এটা তো আমার সেই ডায়েরী, যেটাতে আমি শাহরিন কে নিয়ে সব কথা লিখে রাখতাম! এটায় খিব সুন্দর করে লেখা আছে আমি কখন কিভাবে ওর আগ্রহ চুরি করেছি!

“এটা তুই কোথায় পেলি!” আমার গলায় কথা আটকে যাচ্ছিল। ও যদি ডায়েরীটা পড়ে ফ্যালে, তাহলে!
আমার আশঙ্কাই সত্যি হল! “স্টাডি তে পেয়েছি। পুরনো কাগজ পত্রের মধ্যে। ওটা আমি পড়ে ফেলেছি! তুই… তুই জলজান্ত একটা ফ্রীক!”

আমি ভাবতেও পারিনি কোনদিন আমাকে এই পরিস্থিতিতে পরতে হবে! “আমি নাহয় ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতাটাই ব্যবহার করেছিলাম! বিশ্বাস কর আমার ভালবাসা মিথ্যে ছিল না! আমি ডেসপারেট হয়ে গিয়েছিলাম তোর জন্য!” কোন মতে এতটুকু বলতে পারলাম।
“আমি একজন মানুষ কে ভালবেসেছিলাম। তোর মত একটা ফ্রীক কে না!” ওর কন্ঠে ভয়াবহ ঘৃণা!

ফ্রীক!
ফ্রীক!

কথাটা বার বার কানে বাজছে। স্নায়ুতে বিস্ফোরণ হল যেন! শাহরিন… আমাকে ফ্রীক বলল? শাহরিন? হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা নিংড়ে যাকে দিয়েছি… সে আজ আমায়… অথচ আমি কিনা ভাবতাম এই বিষাক্ত পৃথিবীতে একমাত্র ওই আমাকে বুঝতে পারে, আমার ভেতরটা দেখতে পারে… তবে কি আমাদের ভালোবাসায় জং ধরেছে? আমার মাথার ভেতরটায় আগুন লেগে গ্যাছে। নিজেকে কেন জানি সাপ মনে হচ্ছে। আজ কিছু একটা হবে। খুব খারাপ একটা কিছু!

ঝড়ের গতিতে চলে এলাম কিচেনে। র‍্যাক থেকে নতুন কেনা কিচেন নাইফটা বের করলাম। স্টেইনলেস স্টীলে ফ্লুরোসেন্ট আলো প্রতিফলিত হচ্ছে, আর ঝিকিয়ে উঠছে ওটা। হাতে নিয়ে ধারাল ফলাটা পরখ করে দেখলাম। শার্প, দারুণ ধারালো। বুকে ওর অনেক তৃষ্ণা। রক্ত! রক্ত চাচ্ছে ওটা…… আর একটুক্ষণ পরেই এই ফলায় লেপ্টে থাকবে রক্ত… গাঢ়, কালচে লাল রক্ত। নিচে পড়ে থাকবে একটা এলোমেলো ছোট্ট শরীর… গভীর শ্বাস টানলাম আমি। এখনি যেন রক্তের গন্ধ পাচ্ছি… উষ্ণ নোনা গন্ধ! আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে… উফ, আর ভাবতে পারছি না! আমার এখন রক্ত চাই রক্ত! জন্মের মত আমাকে ফ্রীক বলার সাধ আজ মিটিয়ে দেব!

মৃদু শব্দ পেয়ে ফিরে তাকালাম। আমি খেয়ালই করিনি, কিচেনের দরজায় এসে দাড়িয়েছে শাহরিন। আমার হাতে ধরা নাইফটা দেখে চোখ বড়বড় হয়ে গ্যাছে ওর। বোকা মেয়ে! ভেবেছে আমি আত্নহত্যা করতে চাইছি! কত্ত বোকা মেয়েটা!

খবরদার ইমরান! হাত থেকে ওটা ফেলে দে প্লিজ!
হাঃ হাঃ হাঃ
অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম আমি। আমার ভেতর এখন পিশাচ ভর করেছে। আজ আমাকে নিরস্ত করার সাধ্য কারো নেই।
পাগলামী করিস না জান! প্লিজ। ফেলে দে ওটা! আমি আর কখনো তোর মনে কষ্ট দেব না!
মেয়েটার আকুতি দেখে আমার হাসি পাচ্ছে! আহ! কত্ত ভালোবাসা চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে এখন! মায়াই হচ্ছে…
একটু একটু করে এগুচ্ছে ও আমার দিকে… বোকা নাকি… না না… তুই আসিস না… আমার কাছে আসিস না! ছুরিটা মুঠো করে ধরলাম আমি। হঠাত এক ছুটে কাছে চলে এল শাহরিন। আমার অনেক কাছে। জড়িয়ে ধরল আমাকে।

ভয়ঙ্কর একটা তরঙ্গ বয়ে গেল শরীর দিয়ে। দারুণভাবে কেপে উঠলাম আমি। কিন্তু আমার শরীর অবশ হয়ে আসছে কেন? আমি নড়তে পারছি না কেন? ও আমাকে এভাবে জড়িয়ে রেখেছে কিভাবে! এত কিসের শক্তি ওর?

না! কোনভাবেই না! ও পারবে না আমাকে ধরে রাখতে। আমি হারতে পারি না! অদৃশ্য থেকে শক্তি ভর করল যেন আমার উপর। ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম ওর বন্ধন থেকে। পরক্ষণেই আরেক ঝটকায় ওকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। আমার ভেতরের পিশাচটা জেগে উঠেছে। রক্ত চাই রক্ত!

ধারাল ছুরিটার দিকে এক পলক তাকালাম… পরক্ষণেই চাপা গোঙানির শব্দ শুনতে পেলাম। কখন ছুরিটা শাহরিনের গলায় চালিয়ে দিয়েছি বুঝতেই পারিনি! নাকি ছুরিটা নিজে থেকেই… এখন ওর গলা দিয়ে গোঙানির বদলে ঘড়ঘড় করে এক ধরণের শব্দ বের হচ্ছে! আরে! আমি তো প্রফেশনাল ক্রিমিনালদের মত এক হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে আছি দেখছি! বেচারী… মরার আগে চিত্কারটাও করতে পারল না! একটু মায়াই লাগছিল। পরক্ষণেই ক্রোধটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল! ছুরি ধরা হাতটা আরো কয়েকবার চালিয়ে দিলাম ওর কন্ঠনালীর ওপর দিয়ে। অদক্ষতায় কেটে ফেলা রগ গুলো বিশ্রি ভাবে বাইরে ঝুলে পড়েছে… রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে, আমার পরনের জিন্সেও লেগেছে অনেকটা… এটা ওই গিফট করেছিল আমাকে। আমার জন্মদিনে… ওর শরীরটা এখনও গরম। ওর মুখটা স্পর্শ করলাম আমি। ঘোলাটে চোখে ও কি আমাকে কোন প্রশ্ন করতে চাইছে? কি যেন একটা বলতে চেয়েছিল ও আমাকে… রক্তাক্ত ঠোটে সেই অব্যাক্ত কথাটা ফুটে আছে। কিন্তু সে ভাষাটা আমি জানি না। তাই আমি আর কখনো ওর কথা শুনতে পাবো না।

কখনো না। আর কোনদিনই না!

হঠাৎ করেই মাথার ভেতর থেকে কুয়াশাগুলো কেটে গেল। ভয়াবহ একটা ব্যপার আমি অনুভব করলাম… সারা জীবনে সব কিছুর চেয়ে বেশি যাকে আমি ভালবেসেছি, তাকে এই একটু আগে নিজ হাতে খুন করেছি আমি! ওকে আর কখনো ফিরে পাবনা… বুকের ভেতরটা খুব ফাকা লাগছে, কিচ্ছু নেই সেখানে! আমি পাগলের মত ওর এলোমেলো ছোট্ট শরীরটা জড়িয়ে ধরতে চাইলাম…

কিচেনের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। কে!
“কি খুজছিস তুই ওখানে?” …পরিচিত গলার স্বর না! হ্যাঁ। শাহরিনের গলা! এই গলার স্বর আমি ভুলি কি করে! কিন্তু একটু আগে যে আমি… প্রবল অনিচ্ছা আর ভয় উপেক্ষা করে আমি উপরে তাকালাম।
কাকে দেখছি আমি? এটা তো শাহরিন! তাহলে একটু আগে আমি কাকে…
চকিতে মেঝের দিকে ফিরে তাকালাম। কিচ্ছু নেই! কিচ্ছু না!
আমি কি তাহলে পাগল হয়ে গেলাম!
“অ্যাই! তোর হাতে কি ওটা??” শাহরিনের উদ্বিগ্ন গলা। “খবরদার! ফেলে দে বলছি ওটা এক্ষুণি!”
আমি ছুরিটার দিকে তাকালাম। ফ্লুরোসেন্ট আলোয় কেমন ঝকঝক করছে ওটা, রক্তপিপাসার্ত পিশাচের লকলকে জিহ্বার মত। আজ খুনে তৃষ্ণায় পেয়েছে ওটাকে। রক্ত না পেলে থামবে না!

একবার শাহরিনের মুখের দিকে তাকালাম আমি। হয়ত এই শেষ দেখা। এখন আমি বুঝতে পারছি সন্ধ্যায় আমি কি দেখেছিলাম! ওটা আমারই নিয়তি। নিয়তির বিধান কেই বা বদলাতে পারে! খুব কম মানুষই কোনক্ষেত্রে দুবার সুযোগ পায়… আমি পেয়েছি। এই সুযোগ হাতছাড়া করা অসম্ভব…

ছুরি ধরা হাতটা ওপরে ওঠালাম আমি। চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম শাহরিন ছুটে আসছে আমার দিকে। সময় বেশি নেই। সেকেন্ডের কয়েকভাগের একভাগ সময়ের ভেতর ক্রিচ করে বিজাতীয় একটা শব্দ হল। আশ্চর্য! তেমন ব্যাথা পেলাম না তো! শুধু শ্বাস নিতে পারছি না এই যা। শাহরিন আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর চুলগুলো এলিয়ে পড়ল আমার চোখেমুখে। আহ! কি মিষ্টি একটা ঘ্রাণ ওর শরীরে… অনেক উষ্ণ…

ঘুম পাচ্ছে আমার। এখন আমি ঘুমাবো।

লিখেছেন-আসিফ ইমরান