সালামত ভুইয়া সাহেবের যেদিন কেয়ামত হইলো

সালামত ভুঁইয়া এই মুহূর্তে বেশ খোশমেজাজে আছেন। হাতে টাকাপয়সা আসলে তার মন ভালো থাকে। প্রচণ্ড হিসেবী মানুষ সালামত ভুঁইয়া, মন ভালো রাখার কাজটাও হিসেব করে করেন। ফুর্তি-টুর্তি যা করার এখনই করে নেয়া ভালো, কাজের প্রেশার দুম করে বড়ে যাবে শিগগিরই।
সালামত সাহেব একটা টকশো শেষে বেরিয়েছেন মাত্র। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে খামটা স্পর্শ করতে ভালো লাগে তার। চ্যানেল থেকে দেয়া সম্মানীর টাকা শুধু নয়, সকালে পাওয়া চেকটাও ওই খামে ঢুকিয়ে রেখেছেন। সালামত সাহেবের মুখে একটু চিন্তার ভাঁজ পড়ে। চেক পাওয়া মানে কেবল ফূর্তি না, এর মানে সামনে বহু কাজ, দম ফেলার সময় নেই।
বিরক্তিকর জ্যাম। খোশমেজাজী ভাবটা একটু কাটিয়ে উঠে বিরস মুখে ল্যাপটপটা টেনে নেন সালামত ভুঁইয়া। আরেব্বাস! টকশোর ক্লিপ এর মাঝেই ফেসবুকে ছেড়ে দিয়েছে! লিমন ছেলেটা বেশ করিৎকর্মা, সালামত সাহেব নিজেই ওকে রেখেছেন এইসব ফেসবুক-টুইটার-ইউটিউব দেখার জন্য। ইন্টারনেট, অনলাইন এগুলো সালামত ভুঁইয়ার মাথায় তেমন ঢোকে না। কোনোমতে ফেসবুকের ক খ শিখেছেন বটে, সেও তেমন কাজের কিছু না। মেইল টেইল এসব মনিকাই দেখে দেয়। মনিকা সালামত ভুঁইয়ার মেয়ে, এবার ও লেভেল দেবে। এখনকার ছেলেপেলে গুলো দারুণ শার্প; সালামত্ সাহেব ভাবলেন। পরিকল্পনা করে রেখেছেন, এ লেভেলটা শেষ করলেই বিদেশে পাঠিয়ে দেবে মনিকাকে।
ভিডিওটা চালু করলেন সালামত ভুঁইয়া। ‘আপনারা কথা না শুনলে তো সহিংস হবেই… নেমে যান, নির্বাচন দিয়ে দিন, সহিংসতা থেমে যাবে… আজ গণতন্ত্র অবরুদ্ধ… গণতন্ত্রের মূল্য হিসাবে কিছু মানুষ পুড়বেই…’
বেশী বড় নয়, সাতচল্লিশ সেকেন্ডের ক্লিপ। ছোট হলেই ভালো, ভাবলেন তিনি। বড় জিনিস লোকে খায় না। লিমন ছেলেটা ভালোই কাজ করছে, টাকাপয়সা কিছু বাড়িয়ে দেয়া দরকার।
ভিডিওটা রেখে দিতে হবে, এগুলো ডকুমেন্ট, পরে কাজে দেবে অনেক। ডাউনলোড শুরু করে দিলেন সালামত সাহেব।
সালামৎ সাহেবের খোশমেজাজী ভাবটা কিছুটা ফিরেছে। ভালো কাজ মানে ভালো চেক। উপরের সবাই খুশী। এখন কাজ চালিয়ে যেতে হবে। দম ফেলার সময় নেই। আরামদায়ক সিটে হেলান দিয়ে সালামত সাহেব চোখ বুজলেন; কালকেই একটা কলাম লিখে দিতে হবে, এই ফাঁকে সাজিয়ে ফেললেই ভালো। এবং কী চমৎকার, একদম লাগসই একটা নামও মাথায় চলে এলো – বাঁচাও গণতন্ত্র, বাঁচাও বাংলাদেশ’
আইফোনটা টুং টুং করে বেজে উঠলো হঠাৎ, সালামত সাহেবের মুখটা আবার বিরস হয়ে গেল। কাজের সময়ই দুনিয়ার সবার ফোন আসতে হবে নাকি? ফা… !
– হ্যালো শুনছো? হ্যালো…
পাপিয়ার গলাটা কেমন খ্যাসখেসে মনে হয় সালামৎ ভুঁইয়ার। কাঁদছে নাকি? মেয়েমানুষ!
– আরে শুনতে পাচ্ছি। ব্যাস্ত আছি, তাড়াতাড়ি শেষ করো।
– হ্যালো… শিগগির চলে আসো… শিগগির… হ্যালো…
– আরে কী মুসিবত… হ্যালো… এখন আসতে পারবো না, অফিসে যেতে হবে, অনেক কাজ আছে
– হ্যালো… এখনই আসো… মনিকা…
– মনিকা? মনিকার আবার কী হলো? টাকা চাইলে দিয়ে দাও না। বিরক্ত করো না।
– তুমি শিগগির চলে আসো। ডাক্তার আসছে, রাখলাম এখন।
– মানে? কোথায় আসবো? ডাক্তার মানে?
– ঢাকা মেডিকেল, বার্ন ইউনিট। শিগঘির চলে আসো… রাখছি, ডাক্তার আসছে…
প্রচণ্ড জ্যামের মাঝে স্থানুর মতো বসে আছেন সালামত ভুঁইয়া। ভিডিও ডাউনলোড শেষ হয়েছে, কীভাবে যেন চালুও হয়ে গেছে – ‘আজ গণতন্ত্র অবরুদ্ধ… গণতন্ত্রের মূল্য হিসাবে কিছু মানুষ পুড়বেই… ‘