অষ্ট্রেলিয়ায় আমার ঈদ অভিজ্ঞতা – ড. আবু বকর রফীক

জীবনে কোনদিন ভাবিনি যে পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের পূর্ব দিগন্তে অবস্থিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় মহাদেশ অষ্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলে বিদ্যমান ১টি শহরে রমযানের ঈদ উদযাপন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত এবং এর বাস্তবায়ন অবধারিত। এর ফলে আমাকে মেলবোর্ণ শহরেই ২০১৩ ইং: ১৪৩৪ হি: সনের ঈদ উদযাপন করতে হল। তবে এবারের অষ্ট্রেলিয়া সফর আমার জন্য প্রথমবারের মত অষ্ট্রেলিয়া গমন নয়। ইতোপূর্বে ২০০৮ সালে আরেকবার আমার অষ্ট্রেলিয়া গমনের সুযোগ হয়েছিল। তাছাড়া দেশের বাইরে ঈদ উদযাপনের অভিজ্ঞতাও আমার জন্য এ প্রথম নয়; ইতিপূর্বে সুদান, সউদি আরব ও মালয়েশিয়ায় একাধিকবার ঈদ উদযাপনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

সে যাই হোক, এবারের অষ্ট্রেলিয়া গমনের পেছনে যে কারণটি প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তা হচ্ছে আমাদের কনিষ্ঠ মেয়ে মায়মুনার বিয়ে হয় অষ্ট্রেলিয়া নিবাসী ড. নজমুল হুদা নামক এক যুবকের সাথে। জামাই বাবু চট্টগ্রামের সন্তান। অষ্ট্রেলিয়ায় Swinburne University হতে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করে সেখানেই Post Doc. Researcher হিসেবে কর্মরত। আমাদের মেয়ে মায়মুনা মুসাররাত চট্টগ্রামস্থ আমত্মর্জাতিক ইসললামী বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমবিএ ডিগ্রী সম্পন্ন করে মেলবর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অধ্যয়নরত। বিবাহের তিন মাস পর ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে সে অষ্ট্রেলিয়া চলে আসে। আমাদের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানটি দূরের একটি দেশে কোন্ অবস্থায় কালাতিপাত করছে তা স্বচক্ষে দেখার জন্য একটি অদম্য বাসনা আমি ও তার মা দীর্ঘদিন ধরে লালন করছিলাম।

২. ইতোমধ্যে মেইলযোগে অবহিত হলাম যে Air Asia নামক মালয়েশিয়ান একটি বিমান সংস্থা সাশ্রয়ী ভাড়ায় অষ্ট্রেলিয়া ভ্রমণের একটি অফার দিয়েছে। তবে শর্ত হচ্ছে যে পনের দিনের মধ্যে টিকেট করতে হবে এবং মূল্য পরিশোধ করতে হবে VISA কার্ড এর মাধ্যমে। তখন সময় ছিল ২০১২ সালের আগষ্ট মাস। সমস্যা হচ্ছে আমার কোন ভিসা কার্ড নেই। বিষয়টি আমার মেঝ ছেলে ফুয়াদকে অবহিত করলাম। সে বল্ল: আববু আমার কাছে VISA CARD আছে, আমি টিকেটের ব্যবস্থা এখান থেকে করে দিতে পারব। তখন সে Norway-তে পিএইচডি থিসিস জমা দিয়ে Defense এর জন্য অপেক্ষা করছিল। সে কয়েক ঘন্টার মধ্যে টিকেট বুকিং এর কাজ সম্পন্ন করে মেইল যোগে আমার কাছে টিকেটের কপি পাঠিয়ে দিল। আমাদের যাত্রার তারিখ ঠিক করা হল ৩রা আগষ্ট ২০১৩ কুয়লামপুর হতে। যখন টিকেট হাতে পাই তখনও যাত্রার প্রায় এক বছর বাকী। টিকেটের দাম পড়ল স্বাভাবিক মূল্যের প্রায় ৫০%।

টিকেট হাতে পাওয়ার পর শুরু হল যাত্রার ক্ষণ গণনার (count-down) পালা। মনে হচ্ছিল এ মহেন্দ্রক্ষণটি এখনও অনেক দূরে , নাগালের বাইরে। প্রায় দীর্ঘ এক বছরের ব্যবধান। আদৌ যাওয়া সম্ভব হবে কিনা? মনের মধ্যে এ রকম অনেক প্রশ্ন উঁকি ঝুঁকি মারছে। কিন্তু দেখতে দেখতে যাত্রার সে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ক্ষণটি ঘনিয়ে এল আর ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া এবং মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে মেলবর্ণ এর উদ্দেশ্যে উড়াল দিয়ে Air Asia এর সেই বিমানটি দীর্ঘ নয় ঘন্টা আকাশের বুকে উড্ডয়ন করার পর ৩রা আগষ্ট রাত ১১.৪০ মি. আমি ও আমার স্ত্রীকে নিয়ে মেলবর্ণ বিমান বন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করল। আমরা যেরূপ যাত্রার ক্ষণ গণনা করছিলাম তদ্রূপ মায়মুনাও মেলবর্ণে বসে আমাদের আগমন প্রতীক্ষায় কাউন্ট ডাউন করছিল।

মায়মুনা ও তার স্বামী ড. নজমুল হুদা আমাদের জন্য বিমান বন্দরের বহির্গমন লাউঞ্জের ফটকে অপেক্ষা করছিল অধীর আগ্রহ ও প্রচন্ড ঔৎসুক্য নিয়ে। তখন অষ্ট্রেলিয়াতে রীতিমত শীত মৌসুম। মেলবর্ণের তাপমাত্রা কখনও কখনও ১০ ডিগ্রীর নিচে নেমে আসে। তারা আমাদের জন্য অতিরিক্ত শীতবস্ত্র নিয়ে হাজির ছিল। তবে শীত মওসুমের কথা বিবেচনায় রেখে আমরাও প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র নিয়ে যেতে ভুলিনি।

৩. বিমান বন্দর থেকে জামাতার গাড়িতে চড়ে ত্রিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে আমরা যখন মায়মুনাদের বাসায় এসে পৌঁছাই তখন রাত প্রায় ১টা, আর মাসটি ছিল রমযান। মনে করেছিলাম সাহরী গ্রহণের পূর্বে বোধ হয় আর ঘুমানো সমীচিন হবে না। কিন্তু কার্যত: দেখা গেল রাতের আহার সেরে আরো তিন ঘন্টা ঘুমানোর পরই সাহরী গ্রহণের সময় হল। শীত মওসুম হওয়ার কারণে সেখানে দিবসের দৈর্ঘ ছিল মাত্র ১২ ঘন্টা, পক্ষান্তরে বাংলাদেশে রোযা রেখে এসেছি ১৫ ঘন্টা করে। মনে হচ্ছিল আমাদের জন্য তিন ঘন্টার সাশ্রয় যেন একটি বাড়তি পাওনা। তাই সফর অবস্থায় যে ইসলামে রোযা ছেড়ে দেয়ার অনুমতি রয়েছে সে কথা চিন্তাই করতে হলনা।

৪. ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার ক্ষেত্রে অষ্ট্রেলিয়ান মুসলমানদের নিষ্ঠা চোখে পড়ার মত। অষ্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশী অভিভূত করেছে তা হলো অষ্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার প্রতি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা। মায়মুনাদের বাসা হতে নিকটতম মসজিদটির দূরত্ব তিন কিলোমিটার। মসজিদটির নাম ‘‘মসজিদ আল তাকওয়া’’। এটি মূলত: একটি ইসলামিক সেন্টার। মসজিদের সাথে রয়েছে একটি ইসলামিক স্কুল। মসজিদের ধারণ ক্ষমতা দেড় হাজার। ১০০০ পুরুষ ও ৫০০ মহিলা। উপরের তলাটি নিচ তলার অর্ধাংশ জুড়ে, আর বাকি অংশটুকু উন্মুক্ত। আর তা মাহিলাদের জন্য সংরক্ষিত।

মেলবর্ণ পৌঁছার পর কয়েকদিন আমাদের তারাবীর নামায আদায়ের সুযোগ হয়েছিল। প্রাত্যহিক তারাবীর নামাযে প্রায় ৭০০ পুরুষ ও ৩০০ মহিলার উপস্থিতি ছিল। তবে শেষ তারাবীর রাতে মুছল্লীদের সংখ্যা ছিল রীতিমত উপচে পড়া । এদিন উপরে নিচে অমত্মত: ১৫০০ মুসল্লী তারাবীর নামায আদায় করেন। আর ঈদের নামাযে উপস্থিতি ছিল রীতিমত বিষ্ময়। এ দিন কমপক্ষে তিন হাজার নারী পুরুষ ঈদের নামায আদায় করেন। এদের অন্তত: এক তৃতীয়াংশ ছিল নারী। এ দৃশ্য নববই শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশেও বিরল।

আমার জানার ইচ্ছে হল এ মসজিদের চতুষ্পার্শ্বে বসবাসকারী লোকদের সংখ্যা কত? এবং এদের মধ্যে মুসলিম অধিবাসীর অনুপাত কত? আমাকে জানানো হল যে মসজিদের চতুষ্পার্শ্বে ৫ কিলোমিটার ৎধফরঁং এ মোট জনসংখ্যা দশ থেকে বার হাজার। তা হলে বুঝা যাচ্ছে যে ঈদের জামাতে মোট জনসংখ্যার ২৫% থেকে ৩০% উপস্থিত হয়েছিল। ৫% মুসলিম অধিবাসী অধ্যুষিত একটি দেশের একটি প্রধান শহরের কোথাও ৩০-৪০% বাসিন্দা মুসলিম হওয়া এবং এদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা মসজিদে গমন করা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অথচ বাংলাদেশের মসজিদগুলোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসরত ১০% মুসলমানও মসজিদে গমনে অভ্যস্ত নয়। নারীদের জন্য তো মসজিদে যাওয়া ও ঈদের নামাযে হাজির হওয়া রীতিমত নিষিদ্ধ। অথচ নবীজীর বিশেষ নির্দেশ হচেছ: ‘‘তোমাদের নারীদেরকে ঈদের জামাতে হাজির হতে বারণ করিও না।’’

৫. বাংলাদেশ ছাড়া মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই ও অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশে প্রত্যেক মসজিদে মহিলাদের জন্য নামায পড়ার আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়ে থাকে এবং মুসল্লীদের একটি অংশ থাকে মহিলা।

আমাদের দৃষ্টিতে অষ্ট্রেলিয়ায় ইসলামের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। সরকারিভাবে পরিচালিত জরীপ অনুযায়ী অষ্ট্রেলিয়ায় মুসলিমদের অনুপাত হচ্ছে মাত্র ৪%। প্রকৃত পক্ষে এ অনুপাত ৫% এর বেশি হবে। কারণ জরীপে ধর্ম পরিচয় দান বাধ্যতামূলক না হওয়ার কারণে অনেক মুসলিম নিজের ধর্ম পরিচয়টি জরীপে উল্লেখ করতে চায় না। বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে যে হারে মুসলিমগণ অষ্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন গ্রহণ করছে তাতে মনে হয় ২০৫০ সাল নাগাদ এদের অনুপাত ২৫% এ উন্নীত হতে পারে।

৬. অষ্ট্রেলিয়ার আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে মুসলমানদের জন্য রয়েছে দাওয়াতী কাজের পূর্ণ স্বাধীনতা। সরকারের পক্ষ থেকে কোন বাধা কিংবা নজরদারীর ভয় নেই। অথচ আমেরিকা, কানাডা কিংবা ব্রিটেনে ইসলামী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত লোকদের উপর কড়া নজরদারী বসানো হয়েছে। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম ছাত্রীদের জন্য স্কার্ফ পরিধানের অধিকার পর্যন্ত কোর্টের নির্দেশে রহিত করা হয়েছে।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় হচ্ছে যে মসজিদে উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে যেরূপ প্রাপ্ত বয়স্করা রয়েছেন তদ্রূপ এদের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক শিশু কিশোরও রয়েছে, যা এ কথারই ইঙ্গিত বহন করে যে এখানকার মুসলিম পিতা মাতা নিজেদের সন্তানদের ইসলামী আচার আচরণ মেনে চলার বিষয়টি শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট আন্তরিক।

৭. আরো লক্ষ্য করা গেছে যে অষ্ট্রেলিয়ার বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ Prayer Hall এর ব্যবস্থা করে দিয়ে থাকেন। Swinburne বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত: ৪০০০ বর্গফুটের একটি বিশাল কক্ষ চৎধুবৎ ঐধষষ রূপে চিহ্নিত আছে। এতে ৪৫০ জন পুরুষ ও ৫০ জন মহিলা এক সাথে নামায আদায় করতে পারে। জুমাবারে নাকি এতে একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

ঝরিহনঁৎহব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের সাথে সাক্ষাৎ কালে আমি তাকে এ জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। তিনি আনন্দের সাথে জানালেন যে তিনি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে বিশেষ শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেন। Monash University কর্তৃপক্ষও নাকি দুই মিলিয়ন ডলার (চৌদ্দ কোটি টাকা) ব্যয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ প্রক্রিয়া আরম্ভ করেছে। জানতে পারলাম যে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিশেষ সুবিধা প্রদানের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলের মুসলিম শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা। আমি মেলবর্ণের যে কয়টি সুপার মার্কেট এ গমন করেছি সেখানে অন্তত: ১০% মহিলাকে মস্তকাবরণ পরিধান করতে দেখেছি। যে চিত্র বর্তমানে বাংলাদেশেও বিরল।

৮. সিডনীর মুসলিম সম্প্রদায়: সিডনী হচ্ছে অষ্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম নগরী। রমযানের ঈদের পর ১৩ই আগস্ট আমরা সিডনী গমন করি। আমার অনুজ ড. আবু উমর ফারুক সিডনীর একজন স্থায়ী বাসিন্দা এবং সিডনী শহরে তার নিজস্ব বাড়িও রয়েছে। তাছাড়া আমার ভাগ্নীও সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। সেখানে আমার আরও কজন আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব এবং ছাত্র-ছাত্রীও বাস করে।

সিডনী শহর মেলবর্ণ হতে উত্তর পূর্ব দিকে অন্তত: ১০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ৪০ লক্ষ অধিবাসী অধ্যুষিত এ শহরে মুসলমানদের একটি দৃঢ় অবস্থান রয়েছে। মুসলিম অীধবাসীদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বিভিন্ন আরব দেশ হতে আগত। লাকেম্ব^া নামক একটি অঞ্চলে এদের বসবাস কেন্দ্রিবূত বা কনসেন্ট্রেশন। এখানকার Shopping Centre গুলোতে গমন করলে মনে হবে আপনি যেন আরব দেশের কোন শহরে গমন করেছেন। পুরুষদের জুববা, টুপী, মহিলাদের স্কার্ফ, বোরকা হাত লম্বা কামীজ এবং আতর মিসওয়াক ও জায়নামায থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন দোকানে বিক্রির উদ্দেশ্যে। দোকানের সাইন বোর্ডে ইংরেজির পাশাপাশি আরবি লিখাও শোভা পাচ্ছে। আপনি আরবি ছাড়া অন্য ভাষার ব্যবহার ছাড়াই স্বচ্ছন্দে সওদা করতে সক্ষম হবেন। এখানে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মসজিদ কিংবা মুছল্লা বিদ্যমান। আপনি এ শহরে কিংবা পার্শ্ববর্তী কোন স্থানে বেড়াতে বেরুলে GPS এর মাধ্যমে আবিষ্কার করতে বেগ পেতে হবেনা ৫ থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে একটি মসজিদ কিংবা মুছল্লা (নামাযের জন্য চিহ্নিত স্থান) এর উপস্থিতি।

৯. মেলবর্ণের কিছু দর্শনীয় স্থানের বিবরণ: ১৫ই আগষ্ট রাত্রে আমরা সিডনী হতে মেলবর্ণ ফিরে আসি। হিসেব করি দেখি যে আমাদের অষ্ট্রেলিয়া ত্যাগ কার আর মাত্র চার দিন বাকি। তাই জামাতা ও কন্যা মায়মুনা মিলে এ চার দিনের একটি নির্ঘন্ট তৈরি করে নিল।

১৬ই আগষ্ট জুমাবার চৎবংঃড়হ মসজিদে জুমার নামায আদায় করেই জামাতা নজমুল আমাদেরকে নিয়ে রওয়ানা দিল তাদের বাসা হতে ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি মালভূমির (highland) উদ্দেশ্যে। এ মালভূমির নাম হচ্ছে Lake Mountain যা সমুদ্র হতে ১৩৪০ মি. উঁচুতে অবস্থিত।

পাহাড়ের ঢালু বেয়ে অাঁকা বাঁকা এ পথটি রীতিমত বিপদ সংকুল। তবে লক্ষণীয় যে এটি এমন নিখুঁতভাবে প্রস্ত্তত করা হয়েছে যে কোথাও কোন ভাঙ্গা, ছোট গর্ত কিংবা এমন কোন ত্রুটি নেই যা গাড়ির গতিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কোনখানে কত স্পীডে গাড়ি চালাতে হবে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সকল গাড়িই যেন অভিন্ন গতিতে মিছিল করে এগিয়ে চলছে। ওভারটেক করার জন্য কোন প্রতিযোগিতা নেই। একদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো পর্বতমালা অন্য দিকে পাহাড়ের খাড়া ঢালু। সড়ক সংকেত ও নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা এত নিপুণ যে দুর্ঘটনার আশংকা নেই বললেই চলে। সড়কের উভয় পার্শ্বে লক্ষ লক্ষ হেক্টর জুড়ে বনাঞ্চল। প্রতিটি বৃক্ষের উচ্চতার মধ্যে এক লক্ষনীয় সামঞ্জস্য বিদ্যমান। তবে মওসূমের কারণে বৃক্ষগুলো পত্র -পল্লব শূন্য। মনে হয় যেন লক্ষ লক্ষ মৃত বৃক্ষ নিষ্প্রাণ দাঁড়িয়ে থেকে দর্শকদেরকে নিজেদের দূরাবস্থার বিবরণ দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। নভেম্বর ডিসেম্বরে এসে এসব বৃক্ষ নাকি ফের পত্র পল্লবে সুশোভিত হয়ে যাবে। তখনই এদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে।

গন্তব্যস্থানের যতই নিকটবর্তী হতে লাগলাম দেখতে পেলাম যে সড়কের দুধারে যেন থোকা থোকা তুলার রাশি। আসলে এ গুলো রাত্রিকালে সৃষ্ট বরফ যা মেশিনের সাহয্যে প্রত্যুষে সরিয়ে দেয়া হয়েছে রাস্তার দু পাশে। পাহাড়ের চূড়ায় কয়েকটি হোটেল রেস্তোঁরাসহ পর্যটকদের সেবা দানের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সকল আয়োজন বিদ্যমান। এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, পাহাড়ের চূড়াতে দৃশ্যমান একটি বরফাকৃত ঢালু চত্তর, আর এতে বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে স্কী খেলছে। এ খেলাকে বলা হয় Tobogan। এদের অনেকের গায়ে একটি টি-শার্ট ছাড়া আর কিছুই নেই। অথচ আমরা ঠান্ডা নিবারণের উদ্দেশ্যে রীতিমত ওভারকোট, মাফলার, উলের টুপী ও হাতমোজা পরিধান করে আছি। বাস্তবিক পক্ষে আমরা বাংলাদেশীদের জন্য এটি একটি বিরল অভিজ্ঞতাই বটে।

শনিবার ১৭ই আগষ্ট তারিখেও পূর্ববর্তী দিবসের মত প্রত্যুষে নাস্তার পর্ব সেরে আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে মেয়ে ও জামাতা বেরিয়ে পড়ল আরেকটি নতুন গন্তব্যের পানে। তা ছিল এৎবধঃ ঙপবধহ ঐরমযধিু দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ঘেষে ৩০০ কিলোমিটার দুরত্বের একটি অভিযান। এখানে সড়কের এক দিকে উঁচু পর্বতমালা আর অন্য দিকে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর। কোথাও কোথাও সমুদ্রের ঢেউ যেন সড়কের পাদদেশে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নির্মিত কয়েকশত কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি প্রস্ত্তত করতে কত অর্থ যে খরচ হয়েছে তা আন্দাজ করা সম্ভব নয়। তবে সড়কের মান দেখে মনে হয়েছে যে বাংলাদেশের কয়েক বছরের রাষ্ট্রীয় বাজেটের চাইতেও বেশি অর্থ এতে ব্যয় করা হয়েছে।

সড়কের এক ধারে দিগন্ত প্রসারিত গাঢ় নীলবর্ণের মহাসমুদ্রের জলরাশি আর অন্য ধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতমালা দেখে যে কোন দর্শনার্থী আন্দোলিত না হয়ে পারেনা। পর্বতগুলো দেখলে মনে হয় পুরো পর্বতটি পাথরের তৈরি। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে এ পাথরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার প্রকান্ড আকৃতির বৃক্ষরাজি। পুরো উপকূল জুড়ে স্থানে স্থানে গড়ে উঠেছে কিছু বিচ্ছিন্ন জনবসতি ও বিশাল বিশাল গবাদি পশুর খামার। আমাদের বুঝতে রীতিমত কষ্ট হয়েছে বিশাল সমতল ভূমিতে সমৃদ্ধ এ দেশে কেন লোকেরা পর্বতের ঢালুতে এ সব নির্জন স্থানে তৈরি করেছেন অট্টালিকা সম আবাসন? এর একটি কারণ সম্ভবত: এও হতে পারে যে ছুটির দিনে এখানে এসে দু একদিন অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যেই এ ব্যবস্থা। সেদিন প্রায় পড়ন্ত বেলায় আমরা গন্তব্যে পৌঁছাই এবং সেখান থেকে আন্তনগর হাইওয়ে দিয়ে রাত নয়টার দিকে বাসায় এসে পৌঁছি।

পরদিন ১৮ই আগষ্ট রবিবার। জামাতা বলল্ল আববু আপনাদেরকে নিয়ে আজ আমরা একটি তিন শতাব্দীর পুরাতন শহর দেখতে যাব। আমি জানতে চাইলাম এর বৈশিষ্ট্য কি? জামাতা বলল: এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই, এ শহরটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্বর্ণের খনির জন্য বিখ্যাত ছিল। তখনকার বিবেচনায় এ শহরটি ছিল খুবই উন্নত একটি নগরী। অদ্যাবধি সে বৈশিষ্ট্যই অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বিশেষ করে বাড়ি ঘরের ডিজাইন ও বাহ্যিক দৃশ্য (outlook) এবং সড়ক ব্যবস্থা ইত্যাদি। এ শহরে রয়েছে একটি স্বর্ণ খনির মিউজিয়াম। তাতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে কীভাবে স্বর্ণ উত্তোলন করা হত কীভাবে তা পরিশোধিত হতো সব কিছুই ব্যাখ্যা করা হয়। এ শহরের নাম হচ্ছে Balarat City যা মেলবর্ণ হতে ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

আমরা সকালের নাস্তা সেরে মুনা ও নাজমুলের সাথে সকাল ৮.০০ ঘটিকায় বাসা থেকে রওয়ানা দিয়ে বেলা ১১.০০ টায় Balarat এ পৌঁছাই। তখন আবহাওয়া ছিল প্রচন্ড ঠান্ডা। তদুপরি গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আমাদেরকে রীতিমত অতীষ্ঠ করে তুলছিল। দেখতে পেলাম সে শহরটি লন্ডন সিটির আবাসিক এলাকার আদলে তৈরি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে বাড়ি গুলো শতাব্দী কালের প্রাচীন। আসলে এখানকার অধিকাংশ বাড়িই ১০-২০ বছরের বেশি পুরাতন নয়। লন্ডনেও বাড়ির বহির্ভাগে এমন পদ্ধতিতে পেইন্টিং করা হয়ে থাকে যাতে বাড়িটি যে সদ্য নির্মিত তা বিশ্বাস করা কষ্টকর হয়।

মিউজিয়ামের আয়তন নাকি প্রায় আট বর্গ কিলোমিটার এবং উন্মুক্ত আকাশের নিচে। প্রবেশের জন্য ফী দিতে হয় জনপ্রতি ৪৭ ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০০০/- টাকা। জামাতা আমাদেরকে সেখানে ঢোকার জন্য বার বার অনুরোধ করছিল। আমি দেখলাম যে এত টাকা দিয়ে সেখানে ঢুকে উন্মুক্ত আকাশের নিচে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রচন্ড ঠান্ডায় কষ্ট পেতে হবে তাই বাইরের তথ্যকেন্দ্র থেকে কিছু মৌলিক তথ্য জেনে নিয়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।

কর্মর্সূচি সংক্ষিপ্ত করার কারণে সেদিন বিকালেই আমরা বাসায় ফিরে এলাম। হিসেব করে দেখা গেল যে আমাদের আরও একটি দিন হাতে রয়েছে, অর্থাৎ ১৯ই আগষ্ট। সেদিনটিতে মেলবর্ণ শহর ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত হল। তবে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নয় বরং পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে। জামাতা আমাদেরকে একটি ট্রাম ষ্টেশনে পৌঁছে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেল। আমাদের গাইড ছিল মুনা। বাস ট্রামে চড়ে বেশ কয়েক ঘন্টা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখা হল। বিশেষ করে মেলবর্ণ তথা Victoria Province এর পার্লামেন্ট ভবন পরিদর্শন ছিল এ দিনের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি। পার্লামেন্ট ভবনের একজন কর্মকর্তা বেশ আন্তরিকতা সহকারে আমাদেরকে এর বিভিন্ন কার্যক্রম ও বৈশিষ্ঠ ব্যাখ্যা করেন। এ দিনটি ছিল আমাদের অষ্ট্রেলিয়া সফরের শেষ দিবস। তাই রাত্রে লাগেজ গুছানোর কাজটি সেরে নিয়ে পরদিন প্রত্যুষে বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। সেদিন প্রথম পিরিয়ডে জামাতার ক্লাশ ছিল বিধায় তাদেরকে বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনুমতি দিলাম না। শেষ তক দুজনেই আমাদেরকে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় দিল আর বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সকাল ৯.০০ টায় Air Asia এর বৃহদায়তন বিমানটি আমাদেরকে নিয়ে কুয়ালামপুরের উদ্দেশে উড়াল দিল।

১০. সে যাই হোক, এ বারের মালয়েশিয়া গমন ১৭ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় বার। অষ্ট্রেলিয়া গমনের পথে আমাদেরকে কুয়ালামপুর অবতরণ করে একদিন অবস্থান করতে হয়েছিল আর ফেরার পথেও মালয়েশিয়া হয়ে দেশে ফিরছিলাম। মালয়েশিয়াস্থ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (IIUM) ২৩-২৫ আগষ্ট তারিখে অনুষ্ঠিতব্য 1st World Congress on Islamization and Intergration of Acquired knowledge 2013 (FWCII- ২০১৩) এ একটি paper presentation এর সময়সূচির সহ-অবস্থান (co-incidence) আমার জন্য একটি বাড়তি সুযোগ ছিল। Islamization of Knowldge এর উপর আমি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে আসছি। তাছাড়া IIUM ও IIUC উভয়ের অন্যতম লক্ষ্য (objective) হচ্ছে Islamization of knowledge. এ সম্মেলনে আমার উপস্থাপিত পেপারটির শিরোনাম ছিল:

“A Critical Analysis of New National Education Policy of Bangladesh in the light of the Recommendation of 1st World Conference on Muslim Education, 77.”

আমি আনন্দের সাথে লক্ষ্য করলাম যে উক্ত সম্মেলনে পেশকৃত আমার পেপার&&ট বাংলাদেশি ও বিদেশি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহের সৃষ্টি করেছে এবং এর উপর পর্যাপ্ত পর্যালোচনাও হয়েছে।

এ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুবাদে দেশ বিদেশের অনেক খ্যাতিমান পন্ডিত, আমার অনেক প্রাক্তন সহকর্মী, পুরাতন বন্ধু বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে। আর আমার স্ত্রী লাভ করেছেন কন্যা, পুত্র ও নাতি যুগল পরিবেষ্টিত পরিবেশে কয়েকদিন অতিবাহিত করার সৌভাগ্য।

দীর্ঘ ২৪ দিনের একটি সফরসূচী সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে ২৬ শে আগষ্ট জবমবহঃ অরৎ ডধুং এর একটি ফ্লাইটে অনেক আনন্দ ও অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়ে দেশে ফিরে আসি। সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই জন্যই নিবেদিত।

 

*প্রফেসর ড. আবু বকর রফীক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি: এর শরী‘আহ সুপারভাইজারি কমিটির সদস্য সচিব।