August 29, 2015

ভালবাসার গল্পঃ নীলাদ্রি – চৈতালী সাহা

বেশিদিন নয়, জমিয়ে শীত পরার পর থেকেই মাঝরাতে শব্দটি শুনতে পাচ্ছি। ঘুম জড়ানো কন্ঠে আলতো করে কেউ যেন আমার ডাকনাম ধরে ডেকে যাচ্ছে। দু’অক্ষরের নাম হওয়ায় সহজেই এই আদলের যেকোনো শব্দের সাথে নিজের নামটা গুলিয়ে ফেলা যায়। তাই প্রথমটায় কানে না নিয়ে ঘুমোতে চেষ্টা করলাম।

নীলাদ্রি

নীলাদ্রি

শীতের রাত। মাথার ওপর বৈদ্যুতিক পাখাটা তবু চলছে ঘড়ঘড় শব্দে। গ্রীষ্মপ্রধান মাটির মানুষের শীতকালেও গরম লাগেই মাঝেমাঝে। গ্রীষ্মকে বারোমাস অনুভব করাই আমাদের অভ্যেস। তাই বলে কি মাঝরাতেও শীত করতে নেই? শীতের চোটে এখন ফ্যান বন্ধ রেখেছি। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। অপরাপর সারা বছরের বিনিদ্র রজনীর মতো ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছেনা।

বিরামহীন গতিতে লোকটি ডেকেই চলেছে বেহায়ার মতোন। ক্রমেই অসহ্য লাগছে। এতো রাতে যে শব্দই হোক, করবেটা কে? একবার ভাবলাম ওপর বা নিচতলার কেউ হয়তো ঘুমের মধ্যে নাক ডাকছে। পরক্ষণেই মনের কোণে লুকিয়ে থাকা ভুত-প্রেতের ভয়টি প্রকাশ্যে বেড়িয়ে আসতে চায়। বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ করে ; আমি ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকি। অবশেষে অতিষ্ট হয়ে কামরা ত্যাগ করে মায়ের কোলে গিয়ে নাকমুখ ঢাকা দিয়ে ঘুমোই।

ধীরে ধীরে ভুতের ভয়টা কমতে লাগল ; শব্দটা যখন যাচ্ছেই না তখন শব্দকে আপন করে নেওয়াই ভালো। শব্দ ও শব্দকারী বোধয় ঠিক এটাই চায়। রাত তিনটে বাজতে না বাজতেই শব্দ এসে হাজির.. চলে ফজরের আজান পর্যন্ত। কখনো কখনো শব্দকে ঘুম জড়ানো কন্ঠে অভিযোগ করতে শোনা যায় কেন সে উত্তর পায়না।

আমি তাকে শুনতে না পাওয়ার ভান করে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে পড়ি। শব্দবন্ধু হয়তো আড়াল থেকে তা দেখতে পায়,হয়তো পায় না।
উত্তর দিয়ে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে ইচ্ছে হয়না, পাছে শব্দবন্ধু আবার ভাব নিতে গিয়ে হাওয়া না হয়ে যায়। যদি চলে যায় কষ্ট পাবো। ঘনিষ্ঠতা এমনিই বেড়েছিল.. তুমি ডাকো আমি শুনি- এই টাইপ।
কিছুদিন যেতে অনুভব করলাম তার নামটা জিজ্ঞেস করা দরকার। কিন্তু নাম জানতে হলে যে কথার আদান প্রদান অনিবার্য। সেই সাহস যোগাতে পারলামনা। তাই বলে তো শব্দবন্ধুকে নাম থেকে বঞ্চিত করে রাখা যায়না। নিজেই নামটা রেখে দিলাম। নীলাদ্রি। এত্তো আদুরে গলা লোকটার, কথায় কতো মায়া। তা’কে কী নামহীন করে রাখা ঠিক?

নীলাদ্রির সাথে দু’ঘন্টা করে কাটাতে ঘুম থেকে ছুটি নিয়ে রেখেছি তিনটের পর থেকে।

নীলাদ্রি কেমন করে জানি জানতে পারে তার নতুন একটি নাম রাখা হয়েছে। নাম পেয়ে সে ভারি খুশি। সে জানতে চায় এতো নাম থাকতে নীলাদ্রি কেন? এ প্রশ্নের জবাব তাকে দেয়া হয়নি.. কারন পুরনো। শব্দের আদান প্রদান না করতে আমি দৃঢ়সংকল্প। নীল আমার প্রিয় রং। আমি বিশ্বাস করি যাদের আকার হয়না তাদের একটা রং অবশ্যই থাকে। তাদেরকে ইচ্ছেমত রংএ রাঙিয়ে ফেলা যায়। আমি তাকে নীল রং দিয়ে রাঙিয়েছিলাম। তাই নাম হলো
নীল…নীলাদ্রি।

মাস-দু’মাস নীলাদ্রির সাথে ভালই কাটে। শুধু ভালো কেন, ভীষণ ভালো। এরপর ফাল্গুন আসে। নীলাদ্রি বিনানোটিশে চলে যায়। হারিয়ে যায়। চৈত্র-বৈশাখের গরমেও প্রতিরাতে তিনটেয় উঠে ফ্যান বন্ধ করতে আমার ভুল হয়না। আশা একটিই, নীলাদ্রি আসবে ; শর্মি বলে ডাকবে। নীলাদ্রি আসেনা। ঘুম জড়ানো আদুরে গলার ডাক আর শোনা হয়না। মাস-দুএকের ব্যবধানে সুনসান নীরবতা ঘড়ঘড় পাখার শব্দে যান্ত্রিক রাতে রূপ নেয়.. এত শব্দের ভীড়ে নীলাদ্রির শব্দগুলো ফিরে আসার প্রয়োজন বোধ করে কিনা জানিনা। নীলাদ্রি বড় পাষাণহৃদয়। আমার কষ্টে তার কিছু যায় আসে বলে মনে হয়না।

এখন আমাকে ডাকতে হয় তার নাম ধরে। দুতলার দক্ষিণমুখী ঘরটিতে রোজই কেউ কাউকে ডাকতে শোনা যায়.. আগে শোনা যেত পুরুষ কন্ঠ -এখন নারী কন্ঠ। আগে কেউ হয়তো বলতো ‘এই শর্মি!’ ; আর এখন বলে ‘ওই নীলাদ্রি!’।
তবু দু’টি গলায় এক অদ্ভুত মিল.. ঘুম জড়ানো, আদুরে গলা।

আমিও দু’মাসের ব্যবধানে ভুলে যাই নীলাদ্রিকে। নীলাদ্রি আর কখনো ফিরে আসেনি। এরপর পক্ষ-মাস-বছর গিয়েছে, কখনো নীলাদ্রিকে মনে পড়েছে, কখনো পড়েনি।

২.

ভাবির মুখে শুনেছি বর নাকি কালো. চশমা ছাড়া চলতে পারেনা। বয়সটাও আমার থেকে বছর দশেক বেশি। বোঁচা নাকের মেয়ের জন্য ভালো পাত্র পাওয়া যায়নি বলে কারো সহানুভূতির কমতি ছিলনা।
বিয়েটা হয়েছে একরকম ঘোরের মধ্যেই। বিয়েতে কোনোরকম উৎসাহ বোধ করিনি, বিয়েতে শাড়ীটা সিল্ক-এর পড়েছি কি বেনারসি, খেয়াল করিনি। পাত্রের নামও জানার চেষ্টা করিনি, বিয়েতে বরের মুখের দিকেও তাকাইনি।

এখন রাত তিনটা। ঠিক এই সময়ই একদিন নীলাদ্রির ঘুমঘুম আওয়াজের সাথে প্রথম পরিচয়। এটা নীলাদ্রি আওয়ার। নীলাদ্রির আসার সময়।
ভীষণ ঘুমে চোখের পাতা ঢুলুঢুলু করছে আমার। কি হবে ৩১ বছর বয়সী বুড়োটার জন্য জেগে? কি দরকার এই অর্থহীন ফুলসজ্জার। তবু বুড়োটার প্রতি সবটুকু কৃতজ্ঞতা বিছানায় গুটিসুটি হয়ে বসেই প্রকাশ করতে হবে। এত টাকা খরচ করে বোঁচা নাকের মেয়েকে ঘরে তুলে এনেছেন ইনি। এমনতর সহৃদয় ব্যাক্তি না পেলে বোঁচা নাকের কলঙ্ক ঘুচতো না। তাঁকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, জীবনের ৩১ টা বছরে কয়টি উন্নত নাসিকাবতী রমণীর সাথে সংসার করার স্বপ্ন তিনি বুনেছেন। সেটির সাহস হয়না। ফাঁকি দিয়ে তাঁর সংসারে ঢুকেছি আমি। এ প্রশ্ন করার অধিকার তো আমার নেই।

বুড়োর শখ দেখে গা জ্বালা করে। শ্যামলা চামড়ায় তাঁর নীল শেরওয়ানী মানায় না। তবে কেন তিনি নীল রংটাই পরলেন? উনিও কি কারো নীলাদ্রি ছিলেন? নীল রং ভালোবাসে এমন কারো নীলাদ্রি?

নীলাদ্রির জন্য বরাদ্দ সময়ে নীল পাঞ্জাবি পরা কাউকে ঘরে ঢুকতে দেখে আমার গা ছমছম করে ওঠে। ব্যাপারটা ভালো টিকে না।
নীল পাঞ্জাবি যত কাছে আসে তত অস্বস্তি বাড়ে। নীল পাঞ্জাবি পাশে এসে চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। সে কিছু বলতে চায়। হয়তো নাকটা নিয়ে কিছু সহানুভূতির অবতারণা করবে। আমারো তাঁকে সহানুভূতি জানাতে ইচ্ছে হয় একই কারনে। নেহাত মন্দ কপাল না হলে জেনে বুঝে কেউ একটা বুঁচি বিয়ে করে নিয়ে আসেনা।

নীল পাঞ্জাবি মুখ খুললো।

কিন্তু এ কি। এ যে সেই ঘুম জড়ানো কন্ঠস্বর.. এই,শর্মি। একবার দু’বার চারবার পাঁচবার।

-নীলাদ্রি তুমি?
-অবাক হচ্ছ কেন?
-তুমি কোথায় ছিলে এতোদিন?
-পাশেই তো ছিলাম
-তবে কথা বললেনা যে
-তুমি আমায় খোঁজার চেষ্টা করনি শর্মি।
-ভাবতে পারলে?
-কেন নয়।
আমাকেই অগত্যা খুঁজতে হলো তোমাকে।
-আমি গিয়েছিলাম সাইক্যাক্ট্রিসের কাছে। বললেন টেলিপ্যাথি।

-তারপর কতো জিজ্ঞেস করেছি তোমায় কোথায় তুমি। তুমি কী শুনতে পাওনি?

-মারছো কেন শর্মি। লাগে তো।

-তুমি এমন কেন? আমি তোমায় কত্তো করে ডাকলাম! তুমি কিছু না বলে চলে গেলে। সেই যে গেলে আর ফিরে এলেনা। তোমাকে কিল ঘুষি থাপ্পড় সব মারা উচিৎ।

-আহ্ আসোনা

-হুম বুড়ো।

নীলাদ্রির ঘুম পেয়েছে। ঘুম পেলে সে পুরো বাচ্চা স্বভাবের হয়ে যায়। চোখের পাতা ঢুলছে দু’জনের। ঘুম কাতুরে নীলাদ্রির মাথাটাকে কোলে নিয়ে বসে আছি আমি। শীতের রাত ; মাথার ওপর ঘড়ঘড় শব্দে বৈদ্যুতিক পাখা চলছে। পাখার কল্যাণে নীরবতা কিছুটা মুছে গেছে।