March 21, 2015

মৌলিক ভৌতিক গল্প: আহরিমান এসেছিল

আহরিমান এসেছিল

লেখকঃ প্রয়ান ইমন জুবায়ের স্যার। ( আমি, ফাউন্ডার অফ ফাজলামী ডট কম, ভিষন ভাবে তার মতাদর্শে বিশ্বাসী। তার লেখা অসাধারন কিছু লেখা ব্লগের পাঠক দের জন্য রেখে যাচ্ছি, ভালো লাগবার মত )

প্রখ্যাত রহস্যকাহিনীর লেখক রাহাত কবিরকে তার ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ধারণা রাহাত কবির মৃত্যুর আগে কিছু দেখে আতঙ্কিত হয়ে মারা গেছেন। জনপ্রিয় এই লেখকের শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও মুখে গভীর আতঙ্কের চিহ্ন স্পস্ট। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের দিকে লেখকের মৃত্যু হয়। পয়তাল্লিশ বছর বয়েসি রাহাত কবির রহস্যরোমাঞ্চ কাহিনীর লেখক হিসেবে পাঠকমহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। হঠাৎ করেই সুস্থ সবল একজন জনপ্রিয় লেখকের রহস্যময় মৃত্যুতে দেশের বিভিন্ন মহলে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। সিআইডি ইন্সপেক্টর সোহরাব আলীর ওপর চাঞ্চল্যকর এই মৃত্যুরহস্যের তদন্তের ভার পড়েছে ।
সিআইডি ইন্সপেক্টর সোহরাব আলীর বাড়ি ইন্দিরা রোড। শুক্রবার রাত প্রায় এগারোটায় তিনি যখন রাহাত কবির- এর ধানমন্ডির ফ্ল্যাট থেকে ফিরে তার ভ্যাসপাটি একটি ছ’তলা বাড়ির সামনে থামালেন-তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। কালো রঙের রেইনকোট পরা সিআইডির এই মধ্যবয়েসি দুঁদে ইন্সপেক্টর কে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। তার কারণও অবশ্য ছিল। কিছুদিন ধরে রাহাত কবির ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে একাই ছিলেন। স্ত্রী জোসেফিন কবিরও আলাদা থাকছেন। রাহাত কবির নিঃসন্তান। আজ জোসেফিন কবিরের সঙ্গে ইন্সপেক্টরের কথা হয়েছে। মহিলাকে তেমন শোকগ্রস্থ মনে হল না। খটকা এখানেই। কথা বলে তার স্বামীর সঙ্গে বিরোধের কারণটিও পরিস্কার হয়নি।
ইশরাত বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল। মাজেদা টিভি দেখছিল। বারবার হাই তুলছিল। ওর চোখে ঘুম। ইশরাত বলল, অ্যাই মাজেদা। যা। ঘুমাতে যা।
মাজেদা উঠে চলে যায়।
ইশরাত-এর বয়স কুড়ি। শ্যামলা রঙের মিষ্টি চেহারা। ছিপছিপে লম্বা। মাথার চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। ইশরাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অভ অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ছে । মেধাবী ছাত্রী। আর ভীষণ পড়ুয়া।
ড্রইংরুমে টিউব লাইট জ্বলেছিল। সেই আলোয় ইশরাত কে কেমন বিষন্ন দেখাচ্ছিল । রাহাত কবির-এর মৃত্যু ওকে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছে। প্রিয় লেখকের মৃত্যুতে মেয়েটি কেমন মুষড়ে পড়েছে। রাহাত কবির- এর সর্বমোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বাইশটি। সব বইই ওর পড়া। ইশরাত- এর সবচে ভালো লাগে রাহাত কবির- এর লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। বিশেষ করে ‘ ইটি-রা যখন শহরে এল’ বইটিই ইশরাতের সবচে প্রিয়। রাহাত কবির বানিয়ে বানিয়ে উদ্ভট কিছু লেখেন না। বৈজ্ঞানিক যুক্তির শৃঙ্খল মেনে চলেন। এই বিষয়টিই ইশরাতকে আকর্ষণ করে।
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী কাপড় বদলে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসলেন।মেয়ের সঙ্গে ইন্সপেক্টর সোহরাব আলীর সম্পর্ক অনেকটাই অসম বয়েসি বন্ধুর মতো। ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী নিজে মেধাবী এবং তুখোর বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী। ইশরাতও তাই। ইশরাত কে অনেক কেসে বাবাকে আসিস্ট করে।
ইশরাত বাবার প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বলল, বাবা, আর কিছু ট্রেস করতে পারলে?
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী ভাত মাখতে মাখতে বললেন, না রে মা। রাহাত কবির-এর মৃত্যুর কোনও কূল-কিনারা করতে পারব না মনে হয়।
কেন বাবা? বলে খানিকটা যেন অবাক হয়ে বাবার প্লেটে রুই মাছের টুকরো তুলে দিল ইশরাত।
ঘটনাটা আমার কাছে কেমন ভৌতিক বলে মনে হচ্ছে।
ভৌতিক মানে? বলে তীক্ষ চোখে বাবার দিকে তাকাল ইশরাত। ও বিজ্ঞানের ছাত্রী। কার্যকারণে বিশ্বাস করে। প্রতিটি ঘটনার গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা চাই। ভৌতিক ঘটনায় ইশরাত-এর বিশ্বাস নেই।ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী বললেন, রাহাত কবির – এর মৃত্যুর সময় তার হাতঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে।
বাবার প্লেটে এক স্লাইস লেবু তুলে দিয়ে ইশরাত হেসে বলল, হয়তো কোনও কারণে ওনার ঘড়ির ব্যাটারি ডাউন হয়ে গিয়েছিল।
সে তো বুঝলাম। রাহাত কবির- এর হাতঘড়ি রাত ১২ টা বেজে ১ মিনিটে বন্ধ হয়ে গেছে।
রাত ১২ টা বেজে ১ মিনিটে? কেন? সেরকম কি হতে পারে না?
ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা গেছে ওনার মৃত্যুর সময় ১২ টা বেজে ১ মিনিট।
ওহ্ । ইশরাত এবার অবাক হল বলে মনে হচ্ছে। কী যেন ভাবছে। কী বলবে বুঝতে পারল না।
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী এবার বোমা ফাটালেন। বললেন, রাহাত কবির এর ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের সব ঘড়িই বন্ধ । সময় দেখাচ্ছে রাত ১২ টা বেজে ১ মিনিট । ঠিক ওই সময়েই ফ্ল্যাটের সব ঘড়ি বন্ধ। ভৌতিক না হলে কিভাবে সম্ভব?
ইশরাত এবার ধাক্কা খেল। বিস্ময় ভরা চোখ চেয়ে রইল বাবার মুখের দিকে ।বলল, কোইন্সিডেন্স?
ইম্পসিবল! বলে ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী ছোটখাটো হুঙ্কার ছাড়লেন।
ইশরাত জানে ওর বাবার ভৌতিক ব্যাপার-স্যাপারে বিশ্বাস আছে। খুব সাধারণ যৌক্তিক ঘটনায় অপ্রাকৃত বিষয় খোঁজে বাবা।
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী বললেন, তাই বলছিলাম কেসটা আমার কাছে লিটিল বিট ভৌতিক বলে মনে হচ্ছে। এমন নিরীহ নির্বিরোধী লেখকের শক্র তো থাকার কথা না।তাছাড়া রাহাত কবির রাজনৈতিক লেখা লেখেন না। ইশরাত এবার নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, বাবা, রাহাত কবির কি ডিভোর্সড ?
না, না। ওদের ঠিক ডির্ভোস হয়নি। রাহাত কবির-এর স্ত্রী জোসেফিন কবির কিছুদিন ধরে কলাবাগানে একটা ফ্ল্যাটে আলাদা থাকছেন। আজ ওনার সঙ্গে আমি কথা বলেছি। বেশ স্মার্ট মহিলা। তবে ভদ্রমহিলা বৃহস্পতিবার রাতে লেখকের ফ্ল্যাটে যাননি। এবং অন্য কেউই যায়নি। নীলকুঞ্জ অ্যাপার্টমেন্টের গার্ডরা কনফার্ম করেছে।
রাহাত কবির সম্বন্ধে আর কিছু জানতে পারলে বাবা? যেটা আমরা জানি না। মানে, এই ধর, ওনার পাস্ট। তিনি হয়তো লেখেন ভালো, কিন্ত সবাই তো আর ধোওয়া তুলসি পাতা না।
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী বললেন, হুমম। রাহাত কবির ইদানীং পুরনো ঢাকার নারিন্দায় একটা বাড়িতে যেতেন। বাড়িটা খ্রিস্টানদের পুরনো কবরস্থানের কাছে। রাহাত কবির ওই বাড়িতে যেতেন মধ্যরাতে।
মধ্যরাতে?
হ্যাঁ। মধ্যরাতে।
মধ্যরাতে কেন?
বলতে পারছি না। তবে বাড়ির মালিক হলেন জোসেফ সরকার।
জোসেফ সরকার? অদ্ভূত নাম তো। খ্রিষ্টান?
হ্যাঁ। আর্মেনিয় খ্রিষ্টান।
আর্মেনিয়? বলছো কি বাবা? আর্মেনিয়রা কি এখনও পুরনো ঢাকায় আছে বাবা?
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী ঢকঢক করে একগ্লাস পানি খেয়ে বললেন, কিছু আর্মেনিয় এখনও ঢাকায় আছে। তবে সবাই মিশ্ররক্তের। বলে হাত ধুতে উঠে গেলেন। ইশরাত বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, বুঝলাম। কিন্তু, রাহাত কবির নারিন্দার ওই বাড়িতে মধ্যরাতে যেতেন কেন?
বাড়িটা কাল্ট অভ আহরিমান- এর সাউথ এশিয়ার হেডকোয়ার্টার ।
কি!
নারিন্দার ওই বাড়ি বাড়িটা কাল্ট অভ আহরিমান- এর সাউথ এশিয়ার হেডকোয়ার্টার । বলে হাত ধুয়ে বাথরুম থেকে বেড়িয়ে এলেন ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী । লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে আছেন। সোফায় বসলেন।
ইশরাত চট করে সোফায় বসে জিজ্ঞেস করে, কাল্ট অভ আহরিমান- এর সাউথ এশিয়ার হেডকোয়ার্টার?
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী সিগারেট ধরিয়ে বললেন, হুমম। সাউথ এশিয়ার কাল্ট লিডার হলেন ওই জোসেফ সরকার। বছর কয়েক আগে আবদুল রশিদ নামে আমাদের ডিপার্টমেন্টের একজন এজেন্ট গোপনে কাল্ট অভ আহরিমান- এর সদস্য হয়েছিল ।
তারপর? ইশরাতের নিঃশ্বাস কেমন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এক মুখ ধোঁওয়া ছেড়ে ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী বললেন, আবদুল রশিদ অবশ্য হায়ার লেভেলে একসেস পায়নি। সে কয়েক বছর আগে আমাকে পড়ার জন্য একটা ফাইল দিয়েছিল। কাল্ট অভ আহরিমান- এর সদস্যরা আহরিমান এর উপাসনা করে। আহরিমান হল: প্রাচীন পারস্যের অন্ধকারের দেবতা। এনি ওয়ে। তবে রাহাত কবির কাল্ট অভ আহরিমান- এর সদস্য ছিলেন কিনা তা এখনও জানতে পারিনি ।
কেন? মিসেস রাহাতকে জিজ্ঞেস করনি?
না। তদন্তের স্বার্থেই করিনি। বলে ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী হাসলেন। তারপর বললেন, রাহাত কবির লেখক মানুষ। তিনি হয়তো কৌতূহল থেকে কিংবা লেখার মালমসলার যোগাড় করতেই নারিন্দার কাল্ট অভ আহরিমান- এর হেডকোয়ার্টারে গিয়েছিলেন। তবে কাল্ট অভ আহরিমান- এর গোপন রিচুয়াল থাকলেও তেমন কোনও রাজনৈতিক অ্যাম্বিশন নেই। যে কারনে বাংলাদেশ সরকার ওদের নিয়ে মাথা ঘামায় না।
ইশরাত রহস্যের গন্ধ পায়। বলল, বাবা, কাল একবার আমি রাহাত কবির -এর ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে যাই কেমন?
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী হেসে বললেন, শখের গোয়েন্দাগিরি করবি? আচ্ছা।

ইশরাত এর বিছানায় একটা ডেল ইন্সপিরিয়ন। ও ঘরে এসে বিছানার ওপর উপুর হয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর ল্যাপটপটা অন করে । জানালায় ঝিরঝির বৃষ্টি। গুগলে ‘দ্য কাল্ট অভ আহরিমান’ লিখে সার্চ দিল। অনেক ক’টা সাইট এল। তার মানে কাল্টটি একেবারে অখ্যাত না। কয়েকটা সাইট পড়ে বোঝা গেল: (১) দ্য কাল্ট অভ আহরিমান একটি সিক্রেট কাল্ট। (২) কাল্টটির অন্য নাম ‘মিডনাইট ওয়রশিপারর্স’ বা ‘মধ্যরাতের উপাসক’। (৩) ১৯৫৩ সালে আর্মেনিয়ার জেঘারকুনিক প্রদেশের সেভান হ্রদের উত্তর পাড়ে অবস্থিত সেভান শহরে কাল্টটির উদ্ভব (৪) কাল্টটির পথিকৃৎ কমিটাস হাকভারদিয়ান নামে এক আর্মেনিয় কবি । (৫) কাল্ট-সদস্যরা প্রাচীন পারস্যের অন্ধকারের দেবতা আহরিমান-এর উপাসনা করে। (৬) আহরিমান কে অশুভ শয়তানের ¯্রষ্টা মনে করা হয়। (৭) পৃথিবীর নানা জায়গায় কাল্ট অভ দ্য আহরিমান এর সদস্যরা রয়েছে । (৮) সাউথ ইস্ট এশিয়ায় কেন্দ্র ঢাকা। (৯) কাল্ট অভ দ্য আহরিমান- এর এমব্লেম একটা নীল গোলাপের মাঝখানে ইংরেজি অক্ষর ‘এ’। এ = আহরিমান; (১০) কাল্ট সদস্যরা মধ্যরাতে গুপ্তমন্ত্র উচ্চারণ করে আরহরিমান- এর উপাসনা করে এবং আরহরিমান কে জাগিয়ে তোলে। (১১) আরহরিমান ঠিক ১২ টা বেজে ১ মিনিটে জেগে ওঠে।
আশ্চর্য! রাহাত কবির এর মৃত্যুর সময় রাত ১২ টা বেজে ১ মিনিট। মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর স্টাডিরুমের চেয়ারে বসে ছিলেন। তিনি কি আরহরিমান এর উপাসনা করছিলেন? কিন্তু, রাহাত কবির মধ্যরাতে নারিন্দার ওই বাড়িতে যেতেন। কেন?
নীলকুঞ্জ অ্যাপার্টমেন্টটি ধানমন্ডি ২৭ নং রোডে। ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী নীলকুঞ্জ অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ভ্যাসপা থামানোর পর ইশরাত নামল। ইশরাতের পরনে জিন্স আর নীল রঙের কামিজ। কাঁধে চটের শান্তিনিকেতনি ঝোলা। সকাল ন’টার মতন বাজে। আজ ঝরঝরে রোদ উঠেছে।
ছ’তলা ছিমছাম ফ্ল্যাটবাড়ি। রাহাত কবিরের ফ্ল্যাটটি চার তলায়। গার্ডদের কাছে বাবার পরিচয় দিয়ে লিফটের সামনে চলে আসে। থার্ড ফ্লোরে লিফট থেকে করিডোরে কাউকে দেখতে পেল না । কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে দিল কনস্টেবল ফরিদ মিঞা। ইশরাতকে সালাম দিল লোকটা। ইশরাত লোকটাকে ভালোই চেনে। এখন ফরিদ মিঞা কে সরানো দরকার। ইশরাত বলল, ফরিদ মিঞা?
জ্বে ম্যাডাম। বলেন ।
আমি কিছুক্ষণ এই ফ্ল্যাটে আছি। আপনি নীচ থেকে চা-নাশতা খেয়ে আসেন। যান। বলে একশ টাকার একটা নোট বের করে দিল ইশরাত।
ফরিদ মিঞা মাথা নেড়ে চলে যায়। খুশি হয়েছে মনে হল।
নীলরঙের পুরু কার্পেটে মোড়ানো ড্রইংরুমটা বেশ বড়। মাঝখানে নীল রঙের সোফা সেট। তার সামনে ওপরে কাঁচ-বসানো কালো রঙের টেবিল। টেবিলের ওপর খবরের কাগজ। ফরিদ মিঞা পড়ছিল মনে হয়। জানালায় নীল রঙের পরদা। দেয়ালে নিশাত আলীর আঁকা তেল রঙের ‘উড়ন্ত বক’। এপাশে কালো কাঠের একটি শো কেস। ওপাশে চাইনিজ স্টাইলের একটি ডিভান। ওপরে একটি ওয়াল ক্লক। ১২ টা বেজে ১ মিনিট বাজে।
ইশরাত দ্রুত ঘরগুলি একবার ঘুরে এল । সব ঘরের দেয়ালঘড়ি তেই ১২ টা বেজে ১ মিনিট বাজে। ওর বুক ঢিপঢিপ করছে। দ্রুত পায়ে স্টাডিরুমে এল। প্রিয় লেখকের নির্জন স্টাডিরুমে ঢুকে কান্না পেল ইশরাতের । স্টাডিরুমটা ছোটই; কয়েকটি বইয়ের আলমারি, লেখার একটি ডেস্ক আর কালো রঙের রিভলভিং চেয়ার। ওই চেয়ারে রাহাত কবির কে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পিছনের জানালায় পরদা সরানো বলে রিভলভিং চেয়ারে রোদ পড়েছে। বইয়ের আলমারি তে বাংলা-ইংরেজি বইয়ে ঠাসা। একটা বইয়ের ওপর চোখ আটকে গেল ওর। বইটার নাম: “মাই এক্সপিরিয়েন্স উইথ দ্য কাল্ট অভ আহরিমান” । লেখক-আর্থার স্ট্রিটন। আলমারির পাল্লা খোলাই ছিল। বইটা বের করে শান্তিনিকেতনি ঝোলায় ভরে নিল ইশরাত ।
ইশরাত দ্রুত ভাবছিল। মৃত্যুর রাতে রাহাত কবির কিছু কি লিখছিলেন? কি লিখছিলেন? ডেস্কের ওপর একটি লেখার প্যাড। প্যাডে আধ পৃষ্ঠার মতন লেখা। আশ্চর্য! বাবার চোখে এই প্যাডটা পড়েনি? ইম্পটেন্ট ক্লু হতে পারত! ইশরাত প্যাডটা তুলে নিয়ে শান্তিনিকেতনি ঝোলায় ভরে নিল । তখনই ড্রইংরুমের দরজায় শব্দ হল। ফরিদ আলী এল? এত তাড়াতাড়ি?
ইশরাত ড্রইংরুমে চলে এল। মেইন এন্ট্রান্সের কাছে কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পরা একজন মহিলা দাঁড়িয়ে। মহিলার গায়ের রং ফরসা । ঈষৎ লালচে চুল পিছন দিকে টানটান করে বাঁধা। কানে বড় গোল রিং। কাঁধে বাদামী রঙের ব্যাগ। মহিলার বয়স চল্লিশ-এর কাছাকাছি হবে । ভারি স্মার্ট মহিলা। ইশরাতকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন, হ্যালো। আই অ্যাম জোসেফিন কবির।
ওহ্ । আমি ইশরাত আলী। আমি … আমি ইন্সপেক্টর সোহরাব আলীর মেয়ে। আমি … আমি এই কেসটায় বাবাকে এ্যাসিস্ট করছি।
ওহ্, ইজ ইট। বলতে বলতে জোসেফিন কবির স্টাডিরুমের যেতে থাকে । ইশরাত পিছন পিছন হাঁটতে থাকে । বাতাসে পারফিউমের গন্ধ। জোসেফিন কবির বলল, মিস আলী। আমি কিছু জিনিসপত্র নেব। আমার পারমিশন আছে।
ইশরাত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, দেন ইটস অল রাইট।
জোসেফিন কবির-এর চোখ ডেস্কের ওপর ঘুরছে। তিনি কিছু খুঁজছেন বলে মনে হল। এই সময় রিং টোন বাজল। জোসেফিন কবির ব্যাগ থেকে একটা নকিয়া বার করে। তারপর সেলফোনটা কানে ঠেকিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো সময় ফর্সা ঘাড়ের ওপর ছোট একটা টাট্টু তে চোখ আটতে যায় ইশরাতের। ও চমকে ওঠে । একটা নীল গোলাপ। মাঝখানে ইংরেজি অক্ষর ‘এ’।
জোসেফিন কবির কাল্ট অভ আহরিমান’ কাল্টের সদস্য! ইশরাত টের পায়-ওর হাতের তালু ঘামছে। জোসেফিন কবির চাপাস্বরে কার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে যাচ্ছেন।
ইশরাত ঘড়ি দেখল। দশটা বাজতে পঁচিশ মিনিট। জোসেফিন কবির কথা শেষ করে ইশরাতের দিকে তাকালো। মিষ্টি হেসে বলল, আমার বাবা ফোন করেছিলেন। জানেন, আমার বাবা কবির- এর জন্য সো আপসেট।এমন জিনিয়াস রাইটার ছিল কবির।
পারফিউমের উগ্র গন্ধে ইশরাত এর অস্বস্তি লাগছিল। ও বলল, আমি এখন যাই ।
যাবেন? ওকে।
ইশরাত দ্রুত পায়ে দরজার কাছে চলে এল।
জোসেফিন কবির কাল্ট অভ আহরিমান’ কাল্টের সদস্য।
নীলকুঞ্জ অ্যাপার্টমেন্টের নীল ইউনিফর্ম পরা চার জন গার্ড গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। ইশরাত বলল, আচ্ছা। রাহাত কবির যে রাতে মারা গেলেন- মানে ২৫ তারিখ রাতে কে গার্ড দিচ্ছিল?
বুড়ো মতন একজন গার্ড একটি ফরসা তরুণকে দেখিয়ে বলল, এই সাত্তার আর আমি আফা।
স্যার যে মারা গেলেন সে রাতে রাহাত কবির এর ফ্ল্যাটে কেউ আসেনি না?
না, আফা। কেউ যায় নাই।
আচ্ছা। রাত ১২টার সময় তোমরা কিছু টের পেয়েছিলে?
তরুণ গার্ড বলল, না, আফা।
বুড়ো মতন এক গার্ড বলল, হ আফা। ঘেউ ঘেউ কইরা কুকুর ডাকতে আছিল।
কুকুর ডাকছিল। আচ্ছা, আর কিছু?
আর আফা কড়া হাওয়া দিল। তয় বৃষ্টি হয় নাই আফা।
ইশরাত ওর বাবাকে ফোন করল। ওপ্রান্তে রিং বাজার পর বলল, বাবা?
হ্যাঁ, বল।
বাবা তুমি কি জান-রাহাত কবির- এর ওয়াইফ জোসেফিন কবির কাল্ট অভ আহরিমান এর সদস্য।
সে কী! তুই কি করে জানলি?
একটু আগে জোসেফিন কবির কে দেখলাম। ধানমন্ডির নীলকুঞ্জে এসেছিলেন।
হ্যাঁ। মিসেস কবির পারমিশন নিয়েছে। আর …আর … ওহ্, এবার মনে পড়েছে। মিসেস কবির- এর বাবার নাম তো জোসেফ সরকার । তিনি কাল্ট অভ আহরিমান- এর কাল্ট লিডার ।
ওপ্রান্তে খর খর করে যান্ত্রিক স্বর শোনা গেল । ইশরাত বলল, আচ্ছা বাবা। তোমার সঙ্গে পরে কথা হবে।

বাড়ি ফিরে রাহাত কবিরের লেখার প্যাড আর কাল্ট অভ আহরিমান…বইটা নিয়ে বসল ইশরাত। আগে রাহাত কবিরের লেখাটা তুলে নিল । বল পয়েন্টে নীল কালিতে লেখা। শব্দ সব পরিস্কার না। তবে বোঝা যায়। মাত্র চার-পাঁচ লাইনের মতো লেখা। পড়তে থাকে ইশরাত: হলরুমে উপাসকদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র। আঠাশ বছরের শরীরে টেনশন। রাত বারোটা । রাস্তায় কুকুর ডাকছিল। বাতাস আছড়ে পড়ে বন্ধ জানালায়। এক মিনিট পর হলঘরের দেয়াল ঘড়ি বন্ধ হয়ে যায় । সে এসেছে। সে। আহরিমান। শয়তানের সৃষ্টিকর্তা আহরিমান। সে উঠে এসেছে নরকলোক থেকে । হলঘরে আবছা অন্ধকার। উপাসকদের হৃদয়ে তৃষ্ণা জেগে উঠেছে । সে, রুদ্র দেখতে পায় ছায়ামূর্তি। আহরিমান? মহান প্রভূর পরনে কালো আলখাল্লা। মুখ কালো মুখোশে ঢাকা …
এটাই রাহাত কবির-এর শেষ লেখা। ইশরাত দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে।
মাজেদা পানি দিয়ে গেছে। পানি খেয়ে আর্থার স্ট্রিটন-এর “মাই এক্সপিরিয়েন্স উইথ দ্য কাল্ট অভ আহরিমান” বইটি পড়া শুরু করল। আর্থার স্ট্রিটন ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান নেভিতে। অকাল্ট সাইন্সে আগ্রহ ছিল। ভগ্নিপতির মাধ্যমে কাল্ট অভ আহরিমান সম্বন্ধে জানতে পারেন । চাকরি ছেড়ে স্ট্রিটন কাল্ট অভ আহরিমান এর সিডনি সেন্টারে যোগ দেন। কাল্ট সদস্য হিসেবে মধ্যরাতে আরহরিমান -এর উপাসনা করেন। বইতে গুপ্তমন্ত্র উচ্চারণ করে আরহরিমান কে জাগিয়ে তোলার বিশদ বর্ননা দিয়েছেন। লিখেছেন …. আরহরিমান ঠিক ১২ টা বেজে ১ মিনিটে জেগে ওঠে। সে এক ভয়ানক দৃশ্য। অপরিচিত কেউ কালো আলখাল্লা পরা আহরিমান কে দেখলে হার্ট অ্যাটাক করবে। তবে দৃশ্যমান আহরিমান এর স্থায়ীত্ব মাত্র এক মিনিট। এরপর কাল্টের সদস্যরা অন্যান্য গোপন রিচুয়ালে …
মগ্ন হয়ে পড়ছে ইশরাত।
মাজেদা কখন টেবিলের ওপর চা রেখে গেছে টের পায়নি …

ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী রাত এগারোটার দিকে ফিরলেন। ইশরাত বলল, শোন বাবা। নেটে সার্চ করে আর একটা বই পড়ে কাল্ট অভ আহরিমান সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনেছি।
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী বললেন, বল শুনি কী জানলি?
কাল্ট অভ আহরিমান এর সদস্যরা মধ্যরাতে উপাসনা করে । প্রাচীন মন্ত্রে কাল্ট অভ কে জাগায়। আহরিমান কখন জেগে ওঠে জান?
কখন?
ঠিক ১২ টা বেজে ১ মিনিটে। ইশরাত বলল, রাহাত কবির তো ঠিক ওই সময়েই মারা গেল । না বাবা?
হুমম। ইন্সপেক্টর সোহরাব আলীর মুখ কেমন ভীষণ গম্ভীর দেখাচ্ছে।
ইশরাত বলল, একবার ভেবে দেখ তো বাবা রাহাত কবির-এর শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই। অথচ মুখে আতঙ্কের চিহ্ন রয়েছে। কী দেখে ভয় পেয়েছেন। এবার বুঝতে পারছ?
মনে হচ্ছে বুঝতে পারছি।
বাবা কাল্ট লিডার হওয়ায় রাহাত কবির- এর স্ত্রী জোসেফিন কবির আগে থেকেই কাল্ট অভ আহরিমান- এ ইনভলভ ছিল। দুজনের সর্ম্পকের তিক্ততার কারণ সম্ভবত ওই কাল্ট। রাহাত কবির হয়তো ব্যাপারটা পরে জেনেছে। পছন্দ হয়নি। জোসেফিন কবির আজ স্টাডিরুমে কিছু একটা খুঁজছিল। কি বল তো?
কি?
আহা গেস কর না।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ক্যান নট।
রাহাত কবির এর লেখার প্যাড।
বুঝেছি।
অবশ্য আমি ওটা আগেই সরিয়ে ফেলেছি।
গুড।
রাহাত কবির ইদানীং পুরনো ঢাকার নারিন্দায় ওই বাড়িতে যেতেন। হয়তো তিনি কাল্টকে বুঝতে চেয়েছেন। স্ত্রীকে হারিয়ে বিমর্ষ ছিলেন। তিনি লেখক মানুষ। তিনি কাল্ট নিয়ে গল্প/উপন্যাস লেখার কথাও ভাবতেই পারেন । কাল্ট অভ আহরিমান একটি সিক্রেট কাল্ট। কাল্টের সদস্যরা সম্ভবত চায়নি রাহাত কবির কাল্ট নিয়ে লিখুক।
বুঝলাম কিন্তু তাই বলে ফ্ল্যাটের সব ঘড়ি কেন ১২ টা বেজে ১ মিনিটে বন্ধ হয়ে গেল?
গেস কর।
কি?
কেন ফ্ল্যাটের সব ঘড়ি ১২ টা বেজে ১ মিনিট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল?
কেন?
আহরিমান এসেছিল।
ওহ্ ।
হ্যাঁ । বাবা। রাহাত কবির এর মৃত্যুর ব্যাপারে জোসেফ সরকার আর জোসেফিন কবির কে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
হুমম। এখুনি ব্যবস্থা করছি। বলে ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী কয়েকটা জায়গায় ফোন করলেন। তারপর বললেন, তুই ফোনটা অন রাখিস। আমি তোকে আপডেট দেব।
ওকে বাবা।
ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী যখন বেড়িয়ে যান। তখন রাত সাড়ে এগারো।

মাজেদা ঘুমিয়ে গেছে। মেয়েটা একেবারেই ঘুম সহ্য করতে পারে না। ইশরাত চা তৈরি করে ড্রইংরুমে এসে বসল। দেয়াল ঘড়িতে চোখ ঘড়ি বারো টা বাজতে পনেরো মিনিট। চায়ে চুমুক দেয় ইশরাত। কোলের ওপর ল্যাপটপ। ও জিমেল-এ ক্লিক করে। বড় ভাইয়ার কাছে একটা ইমেইল পাঠাবে। বড় ভাইয়া অষ্ট্রেলিয়া থাকে। মাসখানেক হল মা বড়ভাইয়ার কাছে বেড়াতে গেছে। মাকে ছাড়া ভালো লাগছে না। ইমেল শেষ করে ফেসবুকে “মাই এক্সপিরিয়েন্স উইথ দ্য কাল্ট অভ আহরিমান” বইটির কাভার এর ছবি তুলে ‘নাউ রিডিং’ লিখে ফেসবুকে আপলোড করল। সবচে আগে লাইক দিল রিয়াদ। ইশরাত জানত। ও হাসল। তারপর তাসনুভা, তারপর মন্দিরা, তারপর ফারহান …
হঠাৎ দমকা বাতাসে জানালার পাল্লা দরাম করে ধাক্কা খেল। ইশরাত চমকে উঠল। নীচের গলিতে ভয়ঙ্কর ভাবে কুকুর ডাকতে শুরু করেছে। ইশরাত দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। বারোটা বেজে এক মিনিট। ওর বুকটা ভীষণ ঢিপঢিপ করছে। ঝুঁকে টেবিলের ওপর থেকে এইচটিসিটা তুলে নেয়। বারোটা বেজে এক মিনিট। ডিজিট আর নড়ছে না । বন্ধ। ল্যাটটপের ঘড়ির ডিজিটও এক জায়গায় থেমে আছে। মুখ তুলে দেখল- দেয়ালঘড়ির কাঁটা নড়ছে না। ঘরে টিউব লাইট জ্বলেছিল। আলোটা কেমন আবছা হয়ে যায়। আর ড্রইংরুমের ঠিক মাঝখানে কে যেন দাঁড়িয়ে …একটা ছায়ামূর্তি … কালো আলখাল্লা পরা । ইশরাত চমকে ওঠে। আহরিমান? খেয়াল করে দেখল। ছায়ামূর্তির মাথায় শিং আছে। মুখটা ছুঁচালো। বড় ভয়ানক দৃশ্য। ইশরাত বসে থাকে। ভীষণ ঘামছিল। ও জানে-আহরিমান এর স্থায়ীত্ব এক মিনিট। ওই অপদেবতা কতক্ষণ থাকবে? ইশরাত বসে থাকে …

ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী যখন ফিরলেন তখন রাত দুটো ।
ড্রইংরুমের সোফায় বসে জুতার ফিতা খুলতে খুলতে বললেন, ওদের ডিবি পুলিশের হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ইশরাত বলল, বাবা।
কি বল?
আহরিমান এসেছিল।
ক্বি? কে এসেছিল?
আহরিমান ….
কি বলছিস তুই?
ওই দেখ। বলে হাত তুলে দেয়ালঘড়ি দেখাল ইশরাত।
দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন ইন্সপেক্টর সোহরাব আলী।